পৃথিবীটা কি আসলে খুব বড় কিছু? মহাবিশে^র ছোট্ট একটা গ্রহ মাত্র। অথচ এই পৃথিবীর দাম্ভিক মানুষদের কত গর্ব, কত অহংকার! মানুষ কত সা¤্রাজ্য দেখেছে, কত স¤্রাট দেখেছে, আজ তারা কোথায়? রোম সা¤্রাজ্য, পারস্য সা¤্রাজ্যের অবস্থান আজ ইতিহাসের পাতায়। আর দাম্ভিক স¤্রাটরা মিশে গেছেন মাটির সাথে। এখানে বলার মত বিষয় হলো, দম্ভের পতন যেমন অবশ্যম্ভাবী, তেমনি ক্ষমতারও একটা সমাপ্তি আছে। অথচ চিরায়ত এই সহজ বিষয়টি ক্ষমতাসীনরা বোঝেন না। সীমিত জ্ঞানের শাসকরা নিজেদের মত করে দেশ শাসন করেন, ভিন দেশে আগ্রাসন চালান। পরিণাম ভেবে কাজ করার মতো নৈতিক গুণ তাদের নেই। আপাত লাভ, আপাত বিজয়, তাদের প্রতারিত করে। এ পথেই তো প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ হলো, তৃতীয় বিশ^যুদ্ধের এক অনাকাক্সিক্ষত আবহে এখন মানবজাতির বসবাস। তবুও বুদ্ধিজীবীদের, প্রাগ্রসর নাগরিকদের এবং সভ্যতার শাসকদের মধ্যে বোধোদয়ের তেমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ফ্যাসিস্ট মুসোলিনি ও হিটলারের প্রেতাত্মাদের আবির্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিভিন্ন দেশে। এরা কখনো ভর করে পুতিনের ওপর, কখনো বা ট্রাম্পের ওপর, নেতানিয়াহুর ওপর তো শক্তভাবেই ভর করেছে। তবে আমাদেরও খুশি হওয়ার তেমন কারণ নেই। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের দুর্ভোগ তো আমাদের পোহাতে হয়েছে, যার জের চলছে এখনো। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শুধু বাংলাদেশে নয়, স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শাকদের পতন ঘটেছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলংকা ও নেপালেও। এর টেইলার দেখলাম আমরা ভারতেও। দিল্লির যন্তর মন্তরে আসলে কি ঘটেছে? নানাভাবে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বেশ দোর্দ- প্রতাপের সাথে শাসন করে যাচ্ছেন ভারত। এক দশকের বেশি সময় ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নিজের প্রায় একটা ঐশ^রিক ভাবমূর্তি তৈরি করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। কিন্তু ‘জেন-জি’ খ্যাত তরুণদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এ ক্ষেত্রে তার জন্য তৈরি করেছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। ভিঞ্জি ও মিমস ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যমে ডিজিটাল মিডিয়ায় এখন বয়ান তৈরি করছেন তরুণরা। বিক্ষোভকারীরা শিক্ষাঙ্গন ছাড়াও ভারতের অর্থনৈতিক দুর্গতি ও জবাবদিহির অভাবের বিষয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের প্রধান সমাবেশের স্লোগানে মোদিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। স্লোগানগুলো ছড়িয়ে পড়েছে ভারতজুড়ে। কিছুদিন আগেও এই প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা হতো অনেকটা গোপনে। অথচ এখন প্রকাশ্য রাজপথে তাকে নিয়ে রসিকতা ও টিটকারি করছেন বিক্ষোভকারীরা। সামাজিকমাধ্যমের পোস্ট থেকে সড়কের বিলবোর্ডে মোদির ব্যঙ্গচিত্র এবং তাকে উপহাস করে লেখা সমালোচনা দেশটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এক ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন বিক্ষোভকারী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘৫৬ ইঞ্চির বাঁদর’ বলে স্লোগান দিচ্ছেন। এখানে মোদির একটি গর্বের বিষয়কে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মোদি গর্ব করে নিজেকে ৫৬ ইঞ্চি ছাতির অধিকারী হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। অন্যরা আরো অশালীন ও ব্যঙ্গাত্মক শব্দে তার সমালোচনা করেন। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মোদির ভাবমূর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বর্তমান সরকার বিক্ষোভকারীদের সৃজনশীলতা ও নাছোড় বান্দা মনোভাবের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে।
লেখক অনুরাগ মিনুষ ভার্মা জানান, রাজপথে বিপুল লোকের অবস্থান মানুষের ভয়ের অনুভূতিকে ভেঙে দিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের মাঝে জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘জনতার বিপুল উপস্থিতির জেরে মানুষ তাদের মত প্রকাশ করছেন। আর যখনই তারা নিজেদের মত প্রকাশ করছেন, তা অনেকটা বিস্ফোরণের আকারে আসছে। কারণ, গণতন্ত্রের সব নিরাপদ মতপ্রকাশের পথ এ সরকার বন্ধ করে দিয়েছে।’ লক্ষণীয় বিষয় হলো, তরুণদের বিক্ষোভকে প্রথমদিকে মোটেও গুরুত্ব দেননি মোদি। এছাড়া সরকারের মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা বিক্ষোকারীদের অবজ্ঞা করে মন্তব্য করেন। যার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলছিল, সেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসীদের বি টিম’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ধরনের বাচনভঙ্গি তরুণ ভারতীয়দের কাছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তির মতোই মনে হলো। যিনি গত মে মাসে বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘ককরোচ’ (তেলাপাকা)-এর সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটে তরুণ এক শিক্ষার্থী ব্যঙ্গ করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে একটি দল খোলেন অনলাইনে। সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে এর অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটি ৬০ লাখ পূর্ণ হয়েছে, যা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) চেয়ে তিনগুণ বেশি। উল্লেখ্য, ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর বেশিরভাগই মোদি ও তার দলের সমর্থনপুষ্ট। নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরের বিক্ষোভের খবর এসব সংবাদমাধ্যম খুব কমই প্রচার করেছে। মূলত ইউটিউবার ও ছোট ছোট ডিজিটাল গণমাধ্যমই বিক্ষোভের আসল সম্প্রচার করেছে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের তৎপরতা এমনভাবে রেকর্ড করেছে, যা দেখে কর্মকর্তারা পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যখন লাঠি হাতে তাড়া করেন, তখন বিক্ষোভকারীরা এমনভাবে ভিডিও করেন, যাতে মনে হয় তারা পুলিশ সদস্যদের দৌড় প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিয়েছেন। পুলিশ লাঠি দিয়ে আঘাতের সময় অনেকে ব্যঙ্গ করে আরো মার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন। এমন বাস্তবতা পুলিশ ও সরকারের জন্য সৃষ্টি করেছে এক নতুন পরিস্থিতি। আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়জিৎ পাল বলেন, এ বিক্ষোভের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, মোদি যেভাবে গত এক দশক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রেখেছিলেন, তা আর কাজ করছে না। সরকারের বার্তা দেওয়ার কৌশল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর মানান সই নেই। সরকার এখন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ককরোচ আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছিল এর মূল ইস্যু। চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষায় দুর্নীতি ও অনিয়ম এমন একটি বিষয় যা ভারতের প্রায় সব মধ্যবিত্ত পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আন্দোলনটিকে সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্র বা সাম্প্রদায়িক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্দোলনের চাপ সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি মোকাবেলায় দ্রুত বিচার আদালত গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি একটি ইনস্টগ্রাম ভিডিও প্রকাশ করেন। তবে তাতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। সরকার শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। এদিকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা বলছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদির নীতির প্রতিনিধিত্বকারী। তাই আন্দোলনের লক্ষ্য কোনো একজন মন্ত্রীর অপসারণ ছিল না, বরং লক্ষ্য ছিল সরকারকে প্রকাশ্যে পিছু হটতে বাধ্য করা। তবে শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বা কাঠামোগত সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা সামনে আসেনি। এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে সরকার ও আন্দোলনকারীদের জন্য। প্রসঙ্গত ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দীপকের একটি বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, ভারতের তরুণরা একত্রিত হওয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণ সম্ভব হয়েছে। এ বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, যদি দেশে হিন্দু ও মুসলিমরা এক থাকে এবং বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করে, তাহলে এর চেয়ে বড় বড় সিংহাসনে কাঁপন ধরে যাবে। অভিজিৎ দীপকে আরো বলেন, ‘যদি কোনো হিন্দু-মুসলিম রাজনীতি না থাকে এবং শুধু ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি হয়, আর আমরা যদি হিন্দু-মুসলিম রাজনীতির ঊর্ধ্বে যেতে পারি এবং ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারি, তখন দেশের মঙ্গল হবে।’ অপরদিকে নরেন্দ্র মোদির সরকারকে উদ্দেশ করে সিজেপি নেতা অভিজিত বলেন, ‘বলা হতো এ সরকারে পদত্যাগের কোনো নিয়ম নেই। দুনিয়া ঠিকই মাথানত করে। শুধু মাথানত করানোর জন্য লোক থাকা চাই।’ এখানে আমরা দম্ভের বিপরীতে ইতিহাসের সত্য উচ্চারণ করতে দেখলাম। দেশ আসলে কোনো দল বা ব্যক্তির নয়, দেশ হলো জনগণের। কিন্তু যুগে যুগে বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শাসকরা জনগণকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। এসব গণশত্রুদের পরিণাম কখনো ভালো হয়নি। হয় তাদের পালাতে হয়েছে, নয়তো আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে। মঞ্চে লম্ফঝম্ফ করা এসব খলনায়কদের কোনো না কোনোভাবে পর্দার অন্তরালে চলে যেতে হয়েছে। শুধু হিটলার, মুসোলিনি নয়, নিকট অতীতেও তেমন উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়। আমরা বিশ্বাস করি, দেশ জনগণের। দেশ যেন কখনো এলিট ও কুচক্রীমহলের দখলে চলে না যায়। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যেন নিজ দেশে মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক অদিকার নিয়ে বাঁচতে পারে। আমরা প্রিয় পৃথিবীতে মানুষের সমুন্নত জীবন চাইÑ আমাদের এই আকাক্সক্ষা এবং দোয়া বাংলাদেশ নয়, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইউক্রেন, ইরাক, ইরান নির্বিশেষে পৃথিবীর সব দেশের মানুষের জন্য।