এত ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে বয়সী মানুষের নিঃসঙ্গতা যেন জনসমুদ্রের মাঝখানে এক নির্জন দ্বীপ। চারপাশে মানুষ, অথচ প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন নির্ভরযোগ্য মানুষও অনেকের থাকে না। হাসপাতালের দীর্ঘ লাইন, চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর বিড়ম্বনা, ওষুধ সংগ্রহ কিংবা একটি বাজার করে দেওয়ার মতো সামান্য কাজও অনেক সময় অসাধ্য হয়ে ওঠে। অর্থ দিলেও বিশ্বস্ত মানুষ পাওয়া কঠিন। অথচ অলিগলি, মোড় কিংবা চায়ের দোকানে আড্ডার মানুষের অভাব নেই।

সেবা-শুশ্রূষা প্রত্যাশা করাও যেন অনেক সময় বিলাসিতা। এক শ্রেণির মানুষ বয়সীদের অবহেলা করাকেই অভ্যাসে পরিণত করেছে। তবে আশার আলোও আছে-যারা সচেতন, তারা কখনোই অসুস্থ মা-বাবাকে চোখের আড়াল করেন না। তাঁদের সেবায় দিন-রাত এক করে দেন, বিছানাশায়ী মানুষটির পাশে বসে হাত ধরে সাহস জোগান। কারণ, প্রকৃত সেবা কেবল দায়িত্ব নয়, এটি হৃদয়ের মহত্ত্বের পরিচয়।

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালোবাসার প্রদর্শনী বা বাহ্যিক চাকচিক্যে পিতা-মাতার ঋণ শোধ হয় না। “বৃক্ষ তার ফল দিয়ে পরিচিত হয়, মানুষ পরিচিত হয় তার ব্যবহারে।” মানুষকে প্রতারণা করে হয়তো কিছুদিন চলা যায়, কিন্তু বিবেককে কখনো প্রতারণা করা যায় না। আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন অনেক প্রবীণই কষ্ট লুকিয়ে নীরব থাকেন; তাঁদের নীরবতা দুর্বলতা নয়, বরং মর্যাদার আরেকটি নাম।

একজন প্রবীণ মানুষ শরতের ঝরা পাতার মতো-নিঃশব্দে মাটিতে পড়েন, কিন্তু সেই পাতাই একদিন বৃক্ষকে জীবন দিয়েছিল। আজ যে হাত কাঁপে, সেই হাতই একদিন সন্তানের প্রথম পদক্ষেপে ভরসা হয়েছিল। আজ যে চোখ ঝাপসা, সেই চোখই একদিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন এঁকেছিল।

মনে রাখতে হবে, “একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার প্রবীণদের প্রতি আচরণে।” সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি মানুষের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার। যে ঘরে প্রবীণের মুখে হাসি থাকে, সে ঘরেই প্রকৃত বরকত নেমে আসে। আজ আমরা যাদের বৃদ্ধ বলি, আগামীকাল সেই সারিতে দাঁড়াব আমরাও। সময়ের চাকা কখনো থেমে থাকে না; আজকের তারুণ্যই আগামী দিনের বার্ধক্য।

আসুন, মানুষের প্রতি মানুষ হই। সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিই। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ওষুধের নাম-একটু আন্তরিকতা, একটু সময়, আর একটু ভালোবাসা।

জনসমুদ্রের শহরে প্রবীণ মানুষের নিঃসঙ্গতা: ঢাকা শহরকে বলা হয় মানুষের শহর। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে মানুষের পদচারণা থামে না। রাস্তা, ফুটপাত, হাসপাতাল, বিপণিবিতান, পার্ক, বাসস্ট্যান্ড-সবখানেই মানুষের ঢল। কিন্তু এই জনসমুদ্রের মাঝেও হাজার হাজার প্রবীণ মানুষ এমনভাবে জীবন কাটান, যেন তাঁরা এক একটি নির্জন দ্বীপ। চারপাশে কোলাহল, অথচ দরজায় কড়া নাড়ার মতো একজন মানুষও নেই। মানুষের ভিড় সব সময় সঙ্গ দেয় না; অনেক সময় ভিড়ই নিঃসঙ্গতার সবচেয়ে নির্মম প্রমাণ।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের শক্তি কমে আসে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়, হাঁটতে কষ্ট হয়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে থাকে। তখন একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় পরিবারের সান্নিধ্য, কিছু আন্তরিক কথা, নিরাপত্তা এবং যত্ন। কিন্তু নগরজীবনের ব্যস্ততা, কর্মসংস্থানের জন্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়া সন্তান, একক পরিবার এবং ক্রমবর্ধমান আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা অনেক প্রবীণকে একা করে দিয়েছে।

সকালে একটি বাজার করে দেওয়া, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ওষুধ কিনে আনা কিংবা চিকিৎসকের কক্ষে পৌঁছে দেওয়ার মতো সাধারণ কাজও অনেকের কাছে আজ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। টাকা থাকলেও বিশ্বস্ত মানুষ মেলে না। অর্থ দিয়ে শ্রম কেনা যায়, কিন্তু আন্তরিকতা কেনা যায় না।

হাসপাতালে গেলে এই অসহায়ত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘ লাইন, অসংখ্য পরীক্ষা, এক ভবন থেকে আরেক ভবনে দৌড়ঝাঁপ-সবকিছুই একজন সুস্থ মানুষের জন্য কঠিন, আর একজন প্রবীণের জন্য যেন পাহাড়ে ওঠার সমান। অনেককে দেখা যায় হুইলচেয়ারে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন, পাশে কেউ নেই। আবার কেউ নিজের রিপোর্ট নিজেই হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে করিডোর পার হচ্ছেন। শহরের ব্যস্ত মানুষ তাঁদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়, যেন এ দৃশ্য স্বাভাবিক।

প্রবীণ নির্যাতন সব সময় শারীরিক হয় না। অনেক সময় একটি কঠিন বাক্য, অবহেলার দৃষ্টি, বিরক্তির দীর্ঘশ্বাস কিংবা কথা না বলাও বড় নির্যাতন। যখন একজন বৃদ্ধ বাবা কথা বলতে চান, আর সন্তান মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকে; যখন একজন বৃদ্ধা মা এক কাপ চা ভাগ করে খাওয়ার মানুষ খুঁজে পান না-তখন সেই নীরবতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অপমান।

অনেক পরিবারে সম্পত্তির লোভ প্রবীণদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় জমি, বাড়ি বা সঞ্চয় অন্যের নামে লিখে দেওয়ার জন্য। কোথাও কোথাও মানসিক নির্যাতন, অবহেলা, এমনকি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার চাপও সৃষ্টি করা হয়। সব পরিবার এমন নয়, কিন্তু এ ধরনের ঘটনা সমাজে অস্বীকার করার মতোও নয়। যে মানুষটি সারাজীবন সংসার গড়েছেন, শেষ বয়সে তিনিই নিজের ঘরে পরবাসীর মতো অনুভব করেন।

অপরাধীরাও জানে, একা থাকা প্রবীণ মানুষ সহজ লক্ষ্য। ফোনে প্রতারণা, ব্যাংকের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া, ভুয়া পরিচয়ে অর্থ আত্মসাৎ, বাড়িতে কাজের লোক সেজে চুরিÑএসব ঘটনার শিকার হন অনেক প্রবীণ। তাঁরা লজ্জায় বা সামাজিক সংকোচে অনেক সময় অভিযোগও করেন না।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেক প্রবীণ নিজের দুঃখ কাউকে বলতে চান না। আত্মসম্মান তাঁদের নীরব করে রাখে। সন্তানকে দোষ দিয়ে সমাজে ছোট করতে চান না। নিজের কান্না নিজের ঘরের দেয়ালের কাছেই রেখে দেন। এই নীরবতার শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু এর ভার পাহাড়ের চেয়েও বেশি।

অথচ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ একদিন বার্ধক্যের পথে হাঁটবে। আজ যে যুবক দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছে, কাল তাঁর হাতেও লাঠি উঠতে পারে। আজ যে মায়ের ফোন ধরতে বিরক্ত লাগে, একদিন তাঁর নিজের কণ্ঠও হয়তো সন্তানের অপেক্ষায় কেঁপে উঠবে। সময়ের চাকা কাউকে ছাড় দেয় না।

একটি পুরোনো বৃক্ষ যেমন ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে নতুন চারাকে ছায়া দেয়, তেমনি একজন প্রবীণ মানুষ তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি পরিবারকে দাঁড় করিয়ে রাখেন। তাই শুকিয়ে যাওয়া পাতার দিকে নয়, সেই বৃক্ষের শিকড়ের দিকে তাকানো উচিত। কারণ শিকড় দুর্বল হলে সবুজ পাতাও টিকে থাকে না।

একটি সমাজের মানবিকতা বিচার করা যায় তার প্রবীণ, শিশু এবং অসহায় মানুষের প্রতি আচরণে। সভ্যতার উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ করলেই সমাজ সভ্য হয় না; সভ্য হয় তখনই, যখন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের হাত ধরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মানুষ থাকে, যখন একা থাকা বৃদ্ধ প্রতিবেশীর দরজায় কেউ কড়া নাড়ে, যখন সমাজ বলে-“আপনি একা নন, আমরা আছি।”

“বৃদ্ধ মানুষের সবচেয়ে বড় অভাব অর্থ নয়; সবচেয়ে বড় অভাব একজন মনোযোগ দিয়ে শোনার মানুষ।”

আজ আমাদের দরকার শুধু আইন নয়, মানবিকতার পুনর্জাগরণ। সন্তানদের শেখাতে হবে-মা-বাবার সেবা দয়া নয়, এটি কৃতজ্ঞতা। প্রতিবেশীদের মনে রাখতে হবেÑএকটি খোঁজ নেওয়া, একটি ওষুধ এনে দেওয়া কিংবা হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার মতো ছোট কাজও কারও জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হতে পারে। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত সম্পদ দিয়ে নয়, তার ব্যবহারের স্মৃতিতেই বেঁচে থাকে।