ডা. মু. শফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক করার লক্ষ্যে সরকার আধুনিক (এলোপ্যাথিক) চিকিৎসার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র নিজেই স্বীকৃতি দিয়েছে, সেই ব্যবস্থার চিকিৎসক, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলা ও অনিশ্চয়তার শিকার।

৫,৫০০ নম্বরের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাশিক্ষা: বাংলাদেশে একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক তৈরির প্রক্রিয়া দীর্ঘ, কঠোর এবং মানসম্মত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের একাডেমিক তত্ত্বাবধানে সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৫ বছর মেয়াদি বিএইচএমএস (BHMS) কোর্স পরিচালিত হয়। এই কোর্সে মোট ৫,৫০০ নম্বরের পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করার পর বাধ্যতামূলক এক বছরের ইন্টার্নশিপ শেষ করতে হয়। এরপরই একজন শিক্ষার্থী চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধনের যোগ্যতা অর্জন করেন। এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থা, যার একাডেমিক মান দেশের অন্যান্য চিকিৎসা শিক্ষার মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়।

অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার (AMC): ১৯৯৮ থেকে আজ পর্যন্ত: রাজস্বখাতে পর্যাপ্ত পদ না থাকায় সরকার উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৯৮-২০০৩ সালে প্রথম সেক্টর কর্মসূচির আওতায় অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার (AMC) অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক নিয়োগ শুরু হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচিতে এসব জনবলের চাকরি ধারাবাহিকভাবে বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন শিক্ষক ও চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এই কর্মসূচির অধীনে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রায় ২৪ মাসের বেতনহীন সেবা: কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায় ২৪ মাসের বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। বেতন না পেলেও তাঁরা কর্মস্থল ত্যাগ করেননি; রোগীদের চিকিৎসাসেবা এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন। অথচ তাঁদের পরিবার আজ ঋণ, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

ডা. রনি আলম: শত শত চিকিৎসকের প্রতিচ্ছবি: এই সংকটের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক উদাহরণ সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের ১৮তম ব্যাচের মেধাবী চিকিৎসক ডা. রনি আলম। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ার আর্থিক সংকটের মধ্যেই তিনি কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। একজন চিকিৎসক, যিনি মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়োজিত, তাঁর নিজের চিকিৎসার ব্যয় জোগাতে সংগ্রাম করতে হওয়া রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা।

লেখক : চিকিৎসক ও প্রাবন্ধিক।