মুহাম্মদ খায়রুল বাশার
এক সময় যে সড়কগুলো রোমের দিকে যেত, এখন সেগুলো বেইজিংয়ের দিকে যাচ্ছে। এটি এমন একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন বলে মনে হচ্ছে। রাশিয়া, চীন এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে, অন্যদিকে, চীনের উত্থান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার কারণে বিশ্বরঙ্গমঞ্চে আমেরিকার জন্য টিকে থাকাটা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ নয়; যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো তার আধিপত্য। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে এখনো একটি বিশ্বশক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারে; কিন্তু আমেরিকা তার আধিপত্য হারাতে পারে যেটি তার জন্য আরো উদ্বেগজনক বিষয়। ইতিহাস এখন তাদের দিকেই ছুরি চালাচ্ছে, যারা একসময় শাসন করত। তাদের শাসন এখন উল্টে যাচ্ছে, বিশেষ করে চীনের উত্থানের সাথে সাথে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এর ফলে মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা বিভ্রান্ত, কারণ চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে রাখা তাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন সিল্ক রোডগুলো বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। যেখানে অনেক দেশ একটি উন্নত ভবিষ্যত ও উন্নত অর্থনীতি নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। চীনের প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়া করে ফিরছে। তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং বিধি-নিষেধের কবলে চীনকে সীমাবদ্ধ করে রেখে নিজেদের উদ্বেগ দূর করতে চায়। এছাড়াও, এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে চীনকে সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে একই সময়ে সিল্ক রোড বরাবর বড় ধরনের উন্নয়ন ঘটছে। চীন, এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপে বিনিয়োগ করছে। এই সব রাষ্ট্রে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প অর্থনীতিকে সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত করে মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনছে।
২০১৭ সালে দাভোস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক ভাষণে দেশগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে নয়; বরং একসাথে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, আমাদের আসল শত্রু প্রতিবেশী দেশ নয়; বরং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং পক্ষপাতিত্ব। জিনপিংয়ের এই কথাগুলো বিশ্বকে স্পষ্ট করে দেয় যে, চীন যুদ্ধ চায় না, কিংবা যেসব দেশে তার প্রকল্প চলমান রয়েছে, সেখানে কোনো সংঘাত বা ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনও চায় না। কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুনসেনকে যখন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, ‘অন্যান্য দেশের অনেক ধারণা আছে কিন্তু টাকা নেই। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে যখন তারা কোনো ধারণা নিয়ে আসে, তখন টাকাও নিয়ে আসে।
সর্বোপরি, চীন শুধু বিশ্বব্যবস্থাকেই নতুন রূপ দিচ্ছে না; বরং তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিয়ম-বিধিরও বিরোধী। অবশ্য চীন দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন নিয়ম-কানুনের বিরোধী এবং সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতেও সেরকমই থাকবে। অধিকন্তু, একটি বিষয় স্পষ্ট, কঠিন সময়ে মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা রাষ্ট্রগুলোর কোনো স্থায়ী বন্ধু নেই। তবে, রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদেরকে একটি সন্ধিক্ষণে আছে বলে মনে করে, তখন তারা তাদের মিত্রতা পরিবর্তন করতে থাকে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও চীনের সাথে বাণিজ্য করছে, যেমন কিছু ইউরোপীয় দেশ, অথচ আমেরিকা রাষ্ট্রগুলোকে চীন, তেহরান বা রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য না করার জন্য সতর্ক করছে এবং বলছে যে, এর ফলে তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছিলেন, ‘ইরানের সাথে শান্তিই সব শান্তির জননী এবং ইরানের সাথে যুদ্ধই সব যুদ্ধের জননী।’ সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাকে আমেরিকার অতীতের যুদ্ধগুলোতে বিশেষত ইরাক যুদ্ধে দেশটির দুই ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। এটা ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে, আমেরিকা অতীতের ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে মনোনিবেশ করাটা হলো মূল শিক্ষা। এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা ছাড়া কিছু নয়। অতএব, আমেরিকাকে অবশ্যই ফিরে তাকাতে হবে এবং শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে রাষ্ট্রগুলোর সাথে সহযোগিতা করার জন্য কাজ করতে হবে।
‘পছন্দের যুদ্ধ; প্রয়োজনের শান্তি’-এটি শুধু একটি আকর্ষণীয় স্লোগান নয়। এটি ওয়াশিংটনের একটি বিশাল ভুলের সারসংক্ষেপ। আমেরিকার কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। আমেরিকার ইরান আগ্রাসন প্রকারান্তরে আমেরিকার অপরাজেয় সামরিক শক্তির দর্পচূর্ণ করে দিয়েছে এবং ইরানকে নতুন পরাশক্তির পর্যায়ে উন্নীত করেছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরান তার প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পরবর্তী উচ্চতর স্তরে নিয়ে গেছে। ইরানের বাইরে, রাশিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। চীনের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী আরো বেড়েছে। গার্ডিয়ানের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা মিরা র্যাপ হুপার ইরান যুদ্ধকে একটি ‘সুপার পাওয়ারের আত্মহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন। পরাশক্তি হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তির ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত গর্ব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা প্ররোচিত হয়ে হঠকারী আচরণ করছে।
ভূ-রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও অস্থিরতার মধ্যে বিশ্ব এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের পর থেকে এটি আজ যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অস্থিতিশীল। পুরনো ব্যবস্থা বিদায় নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে যাচ্ছে। বহু পাক্ষিকতা নজিরবিহীন চাপের মুখে রয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল আন্তর্জাতিক পরিম-লকে ক্রমাগত নতুন রূপ দিচ্ছে। এবার কি বহু মেরু ব্যবস্থার সূচনা করবে, নাকি চীন নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে?
লেখক: সহ-সভাপতি, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে।