আসিফ আরসালান

বাংলাদেশের এক শ্রেণির গণমাধ্যম ও সুশীল ও বুদ্ধিজীবী বলে চিহ্নিত একটি মহল সবসময় তক্কে তক্কে থাকেন, কোন উছিলায় জামায়াতে ইসলামীকে জনগণের চোখে হেয়প্রতিপন্ন করা যায়। অতীতে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। স্পষ্ট করে বলা যায় যে, আওয়ামী ঘরানা, ভারতপ্রেমী এবং কমিউনিস্টরা সবসময়ই জামায়াতের ছিদ্রান্বেষণে ওঁৎ পেতে থাকে। অতীতে অসংখ্যবার জামায়াতের বিরুদ্ধে একেবারে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবারই সেসব অভিযোগ যে মিথ্যা, বানোয়াট এবং জামায়াতের অবস্থান যে পরিষ্কার, সেটি ব্যাখ্যা করে জামায়াতকে প্রেসরিলিজ দিতে হয়েছে। আমার তো মনে হয় ভিত্তিহীন সমালোচনা ও অভিযোগের যে জবাব জামায়াত দিয়েছে তার সংখ্যা হয়তো কয়েক হাজার হবে।

তবে এখানে লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, যখন জামায়াতের বিরুদ্ধে পধহধৎফ বা অপপ্রচার চালানো হয় তখন সেগুলো খুব ফলাও করে, প্রায়শই সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করা হয়। জামায়াতের প্রেস উইং এব্যাপারে খুব তৎপর। তারা তৎক্ষণাৎ এসব অপপ্রচারের জবাবে প্রেসবিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় বিষয় হলো, জামায়াত যখন দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে প্রেসবিজ্ঞপ্তি ইস্যু করে তখন জামায়াতের বক্তব্য হয় ছাপা হয় না। অথবা ছাপা হলেও পত্রিকার ভেতরে কোনো এক কোণায় ছাপা হয় যা সাধারণত মানুষের চোখে পড়ে না। এটি একদিনের কথা নয় বরং এটি বিগত ৫৫ বছরের ঘটনা।

মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আরো কিছু প্রাসঙ্গিক কথা বলা প্রয়োজন। এই যে দুর্নীতির কথা, যেটি আমরা শুনছি স্বাধীনতার ডে-ওয়ান থেকে। বাংলাদেশের একটি কর্পোরেট হাউজের একটি বাংলা দৈনিক প্রায় প্রতিদিন দুর্নীতির ওপর লম্বা লম্বা রিপোর্ট করছে। তবে সব রিপোর্টই ড. ইউনূস সরকারের আমলের। আরো রিপোর্ট করছে দমন পীড়নের কথা। বলতে বলতে তারা এতদূরও লিখেছে যে, বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে নাকি এত দুর্নীতি হয়নি, যা ইউনূসের আমলে হয়েছে। ড. ইউনূস মাত্র দেড় বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার আমলে কত দুর্নীতি হয়েছে? বর্তমান সরকার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেখলেই তো পারে। কিন্তু ঐ হাউজটি বলে না যে, শেখ হাসিনার ১৫ বছর ৭ মাস সময়ে যে দুর্নীতি হয়েছে সেটাকে বলা যেতে পারে দুর্নীতির হিমালয় পর্বত। যেদিকে হাত দেবেন সেদিকেই অবৈধ টাকা। সেটা সাবেক আইজিপি বেনজির বলেন, আর সাবেক সেনাকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল হাসানের কথাই বলেন। ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করা কি যে সে কথা! ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে কত টাকা হতে পারে সেটি ক্যালকুলেটরেও আসে না।

গত বৃহস্পাতিবার ২৩ জুলাই ডলার ও টাকার বিনিময় মূল্য ছিলো ১২৩ দশমিক ৩৫ টাকা। সে হিসাবে ২৩৪ মার্কিন ডলার হয় বাংলাদেশী টাকায় ২৮ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর পাচার হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এটা তো গেলো শুধু পাচারের কথা। আর দুর্নীতি ও লুণ্ঠন?

আওয়ামী লীগের দুর্নীতি এবং লুণ্ঠন সম্পর্কে লিখতে গেলে একটি মহাকাব্য লেখা যায়। সেটিই তো একটিমাত্র কলামে সম্ভব নয়। আজ আমরা শুধুমাত্র ২০১৭ সালের শেষ দিকে একসাথে ৭টি ব্যাংক ডাকাতির কথা বলবো। এটিকে ডাকাতি বা লুণ্ঠন বলতে পারেন। কিছুদিন আগে আপলোড করা একটি ভিডিওতে এ ৭টি ব্যাংকে ডাকাত পড়ার কাহিনী বলা হয়েছে। সেই কাহিনীটি নিম্নরূপÑ

২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ভোরের আলো ফোটেনি তখনো। ঢাকার বিভিন্ন পাড়ায় নয়টি বাড়িতে একসঙ্গে দরজায় কড়া নাড়া পড়লো। দরজা খুলতেই সাদা পোশাকের লোকজন বললেন, আপনাকে একটু আসতে হবে। কোথায়? ক্যাণ্টনমেণ্টে। বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ডিজিএফআই-এর হেডকোয়ার্টারে। এ ৯ জনের মধ্যে ছিলেন একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডিরেক্টর, কোম্পানি সেক্রেটারি। সেদিন সকালেই একটি পুরো ব্যাংক হাতবদল হয়ে গেলো বন্দুকের নলের সামনে। শুনতে সিনেমার গল্প মনে হলেও এটা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডাকাতির সত্য ঘটনা।

২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। যার আমানত তখন লাখ-কোটি টাকার বেশি। সেই ব্যাংকের তৎকালীন ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুল মান্নান সেদিন বোর্ড মিটিং-এ যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথেই তাকে ডাইভার্ট করা হলো। নিয়ে যাওয়া হলো ডিজিএফআই হেডকোয়ার্টারে। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আকবর হোসেন। জেনারেল আকবর প্রথমে তার প্রশংসা করলেন। অর্থনীতি নিয়ে কথা বললেন। তারপর বললেন, পদত্যাগ করুন। মান্নান সাহেব রাজি হলেন না। তখন আকবর হোসেন বললেন, উপরওয়ালারা চান আপনি চলে যান। বারবার তার ব্লাড প্রেসার মাপা হচ্ছিলো। শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগপত্রে সই দিলেন। তিনি বলেছেন, তাকে বন্দুকের নলের সামনে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। সেদিন বিকেলেই বোর্ড মিটিং হলো। রেডিসন হোটেলে সেনা কল্যাণ সংস্থার মালিকানাধীন হোটেলে। মিটিং শুরুর আগে সবার ফোন নিয়ে নেওয়া হলো। টেবিলের একপাশে এসে বসলেন এস আলম নিজে। পাশে ডিজিএফআই প্রধান আকবর হোসেন। সে বোর্ড মিটিং-এ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে তুলে দেয়া হলো।

কিন্তু এস আলমের পরিকল্পনা এখানেই শেষ না। একই বছর মানে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ভোরের আঁধারে ৯টি বাড়িতে গিয়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, এসআইবিএল-এর চেয়ারম্যান, মেজর অবসরপ্রাপ্ত রেজাউল হক, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান, কোম্পানি সেক্রেটারিসহ মোট ৯ জনকে তুলে আনা হলো ডিজিএফআই হেডকোয়ার্টারে। সে সময় ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদিন। তৎকালীন কোম্পানি সেক্রেটারি হুমায়ুন কবির পরে বলেছেন তাকে উত্তরার বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়। ডিজিএফআই অফিসে ঢুকেই তিনি দেখলেন একটি চেয়ারে বসে আছেন এস আলম নিজে। যেন তিনি গোয়েন্দা সংস্থার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। হুমায়ুন কবিরকে এস আলম বললেন, বোর্ড মিটিং মতিঝিলের বদলে ওয়েস্টিন হোটেলে নিয়ে যেতে। তারপর বললেন, মিডিয়াকে কিছু বলবেন না। চেয়ারম্যান রেজাউল হক বলেছেন, একজন অফিসার তার হাত ধরে কোমরের পিস্তলে ছুঁইয়ে দেখিয়েছিলেন। পদত্যাগপত্রের ফাঁকা কাগজে শুধু সই নেয়া হয়েছিলো। পরে সে কাগজে ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ লেখা হয়েছে। বিকেলে ওয়েস্টার্ন হোটেলের একটি কনফারেন্স রুমে মিটিং হলো। মাত্র ৩০ মিনিটে বোর্ড মিটিং শেষ। এসআইবিএল-এর মালিকানা চলে গেলো এস আলম গ্রুপের হাতে।

এভাবেই সেদিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৭টি ব্যাংক বন্দুকের মুখে এস আলম তথা আওয়ামী লীগের মালিকানাধীনে চলে গেলো। এর পাশাপাশি তুলনা করুন মাওলানা নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মন্ত্রণালয়। পুরো ৫ বছর তারা মন্ত্রীত্ব করেছেন। শেখ হাসিনা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন, নিজামী বা মুজাহিদের কোনো দুর্নীতি পাওয়া যায় কিনা। ঐ যে কথায় বলে না, ঘন অন্ধকারে বৃষ্টির রাতে লণ্ঠন দিয়ে খোঁজা। তেমনি খোঁজা হয়েছিলো। কিন্তু ২ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে একটি কানাকড়ির দুর্নীতির প্রমাণ তো দূরের কথা, কোনো অভিযোগও পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরার জামায়াতদলীয় এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ ওঠে। অতিদ্রুতই জামায়াতের আমীর ঐ অভিযোগ আমলে নেন এবং তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি জামায়াত কেন্দ্রীয় অফিসে তদন্ত রিপোর্ট সাবমিট করে। রিপোর্টে গাজী নজরুল দোষী সাব্যস্ত হন। জামায়াত তাদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভা ডাকে এবং তৎক্ষণাৎ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কপি জাতীয় সংসদের স্পীকার এবং নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ করা হয়। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযোগপ্রাপ্তি, অভিযুক্তের দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং তাকে বহিষ্কার করা- এ সমুদয় কাজ সমাপ্ত করা হয়। যেটাকে বলা হয় বিদ্যুৎ গতিতে কাজ সমাধা করা । এ কাজে প্রমাণিত হলো যে, দুর্নীতি, অনৈতিকতা বা যে কোনো ধরনের অন্যায়ের ব্যাপারে জামায়াতের রয়েছে জিরো টলারেন্স। এটি যে শুধু মুখের বিষয় নয়, জামায়াতে সেটি কার্যে পরিণত করেছে। বিষয়টি নিয়ে যারা জামায়াতের মতো একটি স্বচ্ছ ও নির্মল সংগঠনকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিলো তারা কি করেছে?

জামায়াতের এ এ্যাকশনের পাশাপাশি আওয়ামী আমলের উপমন্ত্রী মুরাদ হাসানের কাণ্ড-কীর্তি দেখুন। তিনি তো একজন নারী নন, সিনেমা ও সাংস্কৃতিক জগতের অনেক নায়িকাকে নিয়ে ফস্টিনস্টি করেছেন। সেসব কথা তখন খবরের কাগজে এসেছিলো। তার কাণ্ড-কীর্তি এতই নোংরা ছিলো যে, সেগুলো বলতেও আমার রুচিতে বাধে। অথচ তার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা কী করেছেন? তিনি মন্ত্রীত্ব হারিয়েছেন। কিন্তু তাকে তো আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। তার কীর্তি-কলাপ নিয়ে তো তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পীকার এবং ইলেকশন কমিশনকে জানানো হয়নি। মন্ত্রীত্ব গেছে তো কী হয়েছে? মূল শক্তি তো এমপি অর্থাৎ জনপ্রতিনিধি। আর সে জনপ্রতিনিধি হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার সুবাদে। আওয়ামী লীগের নেতা হিসাবে তো হাসিনা তাকে ঠিকই রেখে দিয়েছিলেন। সে ব্যাপারে ঐ কর্পোরেট হাউজের পত্রিকাটি এবং আওয়ামী ও ভারতপ্রেমী সুশীলরা মুখ খোলেন না। ইউনূসের দুর্নীতি নিয়ে লিখে ওরা দিস্তার পর দিস্তা কাগজ ভরিয়ে ফেলেন। কিন্তু ৭টি ব্যাংক লুণ্ঠন এবং ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচারের কথা লিখতে গেলে ওদের ঠোঁট সেলাই থাকে কেনো?

এ কর্পোরেট হাউজের এক কৃতীসন্তানের (?) নোংরামী নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখা হয়েছে। সে নোংরামীতে একজন তরুণী আত্মহত্যা করেছেন। তখন এদের মুখে গোমাই (উত্তরবঙ্গের প্রচলিত শব্দ) লাগানো ছিলো কেনো? আসল কথা হলো, মানুষের বদনামী নয়, বরং তাদের ভালো কাজ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। নৈতিক স্খলনের বিরুদ্ধে জামায়াতের এ বলিষ্ঠ পদক্ষেপ আমাদের রাজনীতির অঙ্গনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।