বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পর অবশেষে ইরান যুদ্ধ থেমেছে। ইরান যুদ্ধ বলা হলেও এটা ছিল ইরানের উপর পরাশক্তি আমেরিকা ও তার দোসর ইসরাইলের একতরফা হামলার নিন্দনীয় ঘটনা। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে দ্বিতীয় দফায় আচমকা হামলা চালায় দুটো দেশ। আলোচনা চলার মধ্যেই এ হামলা বিশ্বব্যাপী নিন্দা কুড়ায়। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মী নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ বহু সামরিক কমান্ডার ও জেনারেল নিহত হন। ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে পড়ে। কিন্তু দেশটি তাতে দমে যায়নি। বিকল্প নেতৃত্ব ও জেনারেলদের সহকারীরা দায়িত্বভার কাঁধে নিয়ে দৃঢ়তার সাথে হামলার মোকাবেলা ও পাল্টা হামলা চালায়। ইরানকে ধ্বংস করে দেয়া ও রেজিম চেঞ্জের যে বাসনা নিয়ে ট্রাম্প হামলা শুরু করেছিলেন সেই লক্ষ্য অর্জিত হতে দেয়নি ঐক্যবদ্ধ জাতি ইরান। এটা সারা বিশ্ব বিস্ময়ের সাথে প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশে মার্কিন ঘাটিতে ও ইসরাইলের অভ্যন্তরে হামলা চালায় ইরান। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নানা হুমকি ধমকি সত্ত্বেও মহাশক্তিধর ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে হয়েছে যুদ্ধ বিরতি।
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলার পর যুদ্ধবিরতি হলেও হামলা ঠিক বন্ধ হয়েছে বলা যাবে না, একটি মধ্য¯থতার মধ্য দিয়ে পক্ষকালের জন্য যুদ্ধ থামাতে রাজি হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আগের দিন তিনি ইরানকে ধুলোর সাথে মিশিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, আর তার এ মাথা গরম করা বক্তব্য সারা বিশ্বে উৎকণ্ঠা জাগায়। খোদ তার নিজ দেশেই তার বক্তব্যকে ভালভাবে নেয়নি মানুষ। তারা এ নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করেন। যাহোক যত গর্জে তত বর্ষে না এটা প্রমাণ করে তিনি নিজেই যুদ্ধ বিরতির ঘোষণা দিলেন। ইরানি ‘সভ্যতা ধ্বংস’ করে দেয়ার হুমকির পর টানটান উত্তেজনার মধ্যে অবশেষে পূর্বঘোষিত বড় ধরনের হামলা থেকে সরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিশ্লেষকরা বলেছেন, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের ফলে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা কিছুটা স্তিমিত হলো। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কিছু সময় আগে এ ঘোষণা এল। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দেয়া বিশেষ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দু’সপ্তাহের জন্য তিনি স্থগিতে রাজি হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, আমরা ইরানের কাছ থেকে ১০ দফার একটি প্রস্তাব পেয়েছি এবং আমরা মনে করি এটি আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি।
ট্রাম্প লিখেন, দু’পক্ষের মধ্যে একটি ‘উভয়মুখী যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে স্থগিতাদেশের প্রধান শর্ত হচ্ছে ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ট্রাম্পের মতে, চুক্তির পথে বড় বাধাগুলো প্রায় কেটে গেছে। তিনি বলেন, অতীতের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রায় সবকটিতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একমত হয়েছে। এই দু’সপ্তাহের সময়কাল চুক্তিটিকে চূড়ান্ত রূপ দিতে এবং সম্পন্ন করতে সহায়তা করবে। ট্রাম্পের এ নাটকীয় ঘোষণার পেছনে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যস্থতা বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন।
যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি বলেন, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে। যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার জন্য উভয়পক্ষ স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘উভয় দেশ যে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছে, আমি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাই। এ উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতায় দু’পক্ষই অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করেছে।’ বিশ্লেষকরা বলেন, পাকিস্তানের ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
চুক্তি অনুসারে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে ইসলামাবাদে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) থেকে এ বৈঠক শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা সেখানে মুখোমুখি বসে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় খুঁজবেন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এ চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরলেও সতর্ক করে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পূর্ণ আস্থা নেই। তবে দু’সপ্তাহের এ সময়কালকে কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার ছিল ডেড লাইন। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী ছিল টান টান উত্তেজনা। হরমুজ প্রনালী খুলে না দিলে ইরানের সভ্যতা একদিনে ধ্বংস করার হুমকি দেন তিনি। তিনি যে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন তা কি জাপানে হামলার মতোই হবে? দিন ভর এ নিয়ে আলোচনা ও সামাজিক মাধ্যমে নিন্দা প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। তবে ট্রাম্পকে বিশ্বাস নেই মানুষের। তিনি কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করেন না, বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক একজন ব্যক্তি এমনটাই মনে করেন অনেকে। ইরানে হামলা নিয়ে খোদ তার নিজ দেশেই প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে, রাস্তায় নেমে মানুষ ইরানে হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন । তিনি আরো বলেন, বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষা এবং মানবিক দুর্ভোগ কমানোর জন্য অবিলম্বে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা প্রয়োজন। যদিও এ যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘেরই ভ’মিকা রাখার কথা ছিল। কিন্তু জাতিসংঘ এখন কার্যত আর বিশ্ব শান্তিতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনীতির প্রচলিত ধারণা ছিল যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা তিনটি পরাশক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে- ত্রা হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। এ ধারণার মূল ভিত্তি ছিল দেশগুলোর অর্থনীতির আকার ও সামরিক সক্ষমতা। তাদের মতে কিন্তু সে পুরোনো ধারণা এখন আর খাটছে না। বিশ্বে দ্রুতগতিতে চতুর্থ একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির উত্থান ঘটছে, সেটি হলো ইরান।
যদিও অর্থনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ইরান বাকি তিন পরাশক্তির সমকক্ষ নয়, তবু দেশটির নতুন এই ক্ষমতার উৎস হলো বিশ্ব অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলে পরিচিত হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একক নিয়ন্ত্রণ।
তারা আরো বলেন, যুদ্ধে অর্থনৈতিক পরিণতিগুলো প্রায়ই সামরিক লক্ষ্যের চেয়ে ভিন্ন একটি যুক্তিতে চলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিনা উসকানিতে চালানো অবৈধ হামলা এর একটি বড় নজির। এ দু’আগ্রাসনকারীর উত্থাপিত বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্যের মধ্যে (যদিও যা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে) তেহরানকে দুর্বল করার আকাক্সক্ষাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এ সংঘাতের সবচেয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক প্রভাব মূলত ওয়াশিংটনের ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের ওপরই পড়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকা হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধের কারণে যুদ্ধটি একটি অসম ধাক্কা দিয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়া এখন জ্বালানি-সংকট, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বিশ্ববাণিজ্যের গতিপথ পরিবর্তনের ধকল সহ্য করছে।
ভয়াবহ এ যুদ্ধে প্রাণহানির তালিকা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ। এটাই হয়তো চূড়ান্ত হিসাব নয়। দেয়া তথ্য মতে ইরানে ৩,৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১,৭০১ জনই বেসামরিক নাগরিক, যার মধ্যে অন্তত ২৫৪ জন শিশু । ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলী হামলায় ইরানে অন্তত ১,৯০০ জন নিহত এবং ২০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন হামলায় আরও ১০৪ জন নিহতের দাবি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।
লেবানন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১,৫৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২৯ জন শিশু। ইরাকের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সংকটের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। ইসরাইলের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, ইরান ও লেবানন থেকে ছোড়া মিসাইলে দেশটিতে ২৩ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে তাদের ১১ জন সৈন্য নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এছাড়া নিজস্ব বাহিনীর গুলিতে এক ইসরাইলী কৃষক নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের ১৩ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৩০০-এর বেশি আহত হয়েছেন। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ জন, কাতারে ৭ জন, কুয়েতে ৭ জন, বাহরাইনে ২ জন, ওমানে ২ জন ও সৌদি আরবে ২ জন নিহত হয়েছেন।
দু’সপ্তাহ পরে কি হবে এ নিয়ে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন রয়েছে, এ প্রশ্ন সবারও। পাকিস্তানের অনুরোধে ট্রাম্প দু’সপ্তাহের জন্য ইরানে হামলা স্থগিত করেন। বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ চলাচলের অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে ইরান। এ পদক্ষেপ বিশ্বের তেল সরবরাহে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সারাবিশ্বে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে ও মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, এ খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। তবে পাকিস্তানে পরবর্তী ধাপের আলোচনায় কী হয় সে দিকে দৃষ্টি সবার।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।