মাহবুবুল হক

আমি যখন দেশের অবস্থা বলে কোনো কথা শুরু করি তখন আমার প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞ বন্ধুজন বলেন রাষ্ট্র না বলে আমি দেশ বলি কেন। আমিতো আমার সক্রেটিসের মতো বন্ধুদের শক্ত করে একথা বলতে পারি না যে আমাদের দেশটা এখনও রাষ্ট্র হয়নি। রাষ্ট্র হতে হলে বহুকিছু লাগে। পাকিস্তান হওয়ার পরপরই যখন রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন উঠলো তখনইতো পূর্ববাংলার ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত বিজ্ঞজন বলে উঠলেন আমরা তো এখনও দেশই গড়তে পারিনি, রাষ্ট্রতো দূরের কথা। তার ওপর আমরা হলাম দেশের একটা অংশ, প্রদেশ। এখন আমরা খুব বেশি হলে প্রদেশের জন্য এটা সরকারি ভাষার দাবি করতে পারি। অর্থাৎ আমরা পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য বাংলাভাষা দাবি করতে পারি। এখন তো আমরা ‘ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার’।

তমুদ্দুন মজলিসের বাঘা বাঘা নেতৃবৃন্দ যুক্তি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, ভারত ভাগ হয়ে দু’টি রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। প্রথমে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র জন্ম হয়েছে। ঠিক পরের দিন ১৫ আগস্টে ইন্ডিয়া নামে পাশাপাশি আর একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।

তমদ্দুন মজলিসের বাইরে সেক্যুলার ও বামপন্থী যারা ছিলেন তারা বললেন, ১৫ আগস্টে যে রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছে সেটাকে আপনারা রাষ্ট্র বলতে পারেন। কারণ সেখানে সাথে সাথেই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন। অপর দিকে পাকিস্তান বলে মুসলমানদেরকে খুশি করার জন্য ১৪ই আগস্টে যে তথাকথিত রাষ্ট্রটি গঠন করা হয় তাকে আপনি কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্র বলতে পারেন না। কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসার জন্য কেনো প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকে বসানো হয়নি। বসানো হয়েছে ব্রিটিশ সরকারের একজন গভর্নর জেনারেল। অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এ রাজ্য দেখাশোনার জন্য একজন প্রধান কর্মচারী (সিইও) বসান হয়।

স্বাধীন কোনো রাষ্ট্রের প্রধান বা চিফ কখনও গভর্নর জেনারেল হতে পারেন না। হতে পারলেও তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হতে পারেন না। পাকিস্তানের স্থপতি কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের ক্ষণজন্মা নেতৃবৃন্দ বিষয়টি অনুধাবন বা উপলব্ধি করেননি তা নয়। কিন্তু একদিকে জিন্নাহ’র স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি, অন্যদিকে ভারতীয়দের আধিপত্যবাদী মনোভাব লক্ষ্য করে মুসলিম লীগ সময়ক্ষেপণের রিস্ক নিতে চায়নি। সে কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ১৪ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে আসেনি। এসেছে অনেক পরে। বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এরই ধারাবাহিকতায় অর্থাৎ ৪৭/৪৮-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে বাম ও সেক্যুলারপন্থীরা পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনে রূপ দেয়।

ভাষা নিয়ে ১৯৫২ সালে যে আন্দোলন করা হয় তার নাম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিলোনা। ছিলো ‘বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন’। এসব কারণে ইতিহাসবিদদের একাংশ উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তান যদি ১৯৪৭ সালে স্বাধীন রাষ্ট্রে উপনীত হতে পারতো, তাহলে ইন্ডিয়া যে অন্যান্য মুসলিম রাজ্যকে স্বাধীনতা দেয়নি, সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের শক্ত ভূমিকা থাকতে পারতো। রাষ্ট্র না হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায় না।

ব্রিটিশরা একদিকে পাকিস্তানের ক্ষমতার শুরু থেকে নিজেদের হাতে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের সদ্যগঠিত সেনাবাহিনীকে নিজেদের করতলে রেখেছিলো বলেই পাকিস্তানের তদানিন্তন সেনাবাহিনী ইন্ডিয়ার আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণশীল অভিযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। শুরু থেকেই ইহুদী ও নাসারাদের ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত মজবুত হওয়া দূরের কথা ফাউন্ডেশনই তৈরি করা হয়নি। যে কারণে দুই যুগের মধ্যেই পাকিস্তানের মূল অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।

বাংলাদেশে ফাউন্ডেশন ছাড়া ইতিমধ্যেই তৈরি হওয়া বেশ কিছু হাইরাইজ বিল্ডিং পড়ে গেছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশের উপর তলার উঁচুস্তরে, প্রফেশনালগণ দেশ, জাতি বা রাষ্ট্রকে কোনো দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করে থাকে। গত ৫৪ বছরে আমরা যত উন্নয়নের কাজ করেছি তার অন্ততঃ ২৫% ইতিমধ্যেই ধ্বংসলীলায় পরিণত হয়েছে। বাকিটা ভূমিকম্প, ঝড়, বন্যাসহ প্রাকৃতিক বিপর্যদের মুখে পতিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এই বিল্ডিং ভেঙে পড়ছে, ঐ সেতু ভেঙে পড়ছে, রাস্তা-ঘাট ও হাইওয়ের কথা বলাই বাহুল্য। রাস্তার গল্প তো বলতে গেলে রস-রচনা। সকালে পিচঢালা হয় বিকেলে সেই পিচের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। রেলওয়ের কথা কি বলা যাবে, এ যেন এক প্রেম-বিরহের লুকোচুরি অথবা আরও পরিষ্কার করে বলা যায় বিয়ে-তালাকের হা-ডু-ডু খেলা। এই আছে এই নেই। ব্রিটিশ আমলের রেল ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে নিরপেক্ষ যেকোনো মানুষের উপলব্ধি হবে যাদেরকে আমার হরহামেশা বেনিয়া বলে গাল দিচ্ছি তারা যেন ভারত ভূমিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার পরিকল্পনা নিয়েই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে শাসনক্ষমতা হাসিল করেছিলো। এতটাই মজবুত ছিলো রেল ব্যবস্থা ও রেলের সাথে সংযুক্ত সেতু ব্যবস্থা। বাংলাদেশে রেলওয়ে ইঞ্জিনের গতি যেখানে লেখা থাকে ঘণ্টায় ১০০কিলোমিটার সে জায়গায় বাস্তবে ৬০কিলোমিটার চলতেও হিমসিম খায়। রেলগাড়ি এখানে সবসময় দূরু দূরু বুকে চলে। পুরোনো বা নতুন সেতুর ওপর দিয়ে চলতে গেলে আল্লাহ আল্লাহ করে। এসবের মধ্যেই রাজনীতি নামের তাবিজ-কবজ ধারণ করে আমরাতো অর্ধ শতাব্দির বেশি সময় কত আনন্দ বেদনায়, মিলন-বিরহ সংকটে পার হয়ে এসেছি। আমাদের ধৈর্য নাই কিন্তু স্টেমিনা আছে। সেই স্টেমিনাটা আবার স্বপ্ন দেখার জন্য।

ইন্ডিয়া রাষ্ট্রের বয়স ৮০বছর। আর দু’বার স্বাধীনতা পেলেও আমরা এখনও দেশ-দেশ বন্দনার মধ্যে পড়ে আছি।

‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। অথবা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’। অথবা ‘এমন দেশটি কোথাও, খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’।

আবার-

অবারিত মাঠ গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি

ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়, ছোট ছোট গ্রাম গুলি

পল্লব ঘন আম্র কানন, রাখালের গেহ-

স্তব্ধ অতল দীঘি কালো জল, নিশীথ শীতল স্নেহ

বুক-ভরা-মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে

মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।

এতো ছিলো আমাদের স্বপ্নের দেশ, তথা স্বপ্নের রাষ্ট্র। আমরা তো এর চেয়ে বেশি কিছু চাইনি। আমরা তো, আমাদের স্বপ্নের মধ্যেও প্রাচ্যের বা প্রতীচ্যের কোনো রাষ্ট্রের মতো দেশ চাইনি, রাষ্ট্র চাইনি। আমরা অল্পে তুষ্ট থাকতে চেয়েছিলাম। অল্পের মধ্যে আনন্দে বাঁচতে চেয়েছিলাম। অনেকেই বলেন, আমাদের অনেক পরে স্বাধীনতা পেয়েও ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশ কত উন্নত হয়েছে। আমরা কেন উন্নতি করতে পারলাম না। এ নিয়ে কত আফসোস, কত দুঃখ, কত বেদনা আমাদের। কত চেতনা আমাদের। টকশোতে ঘুরে-ফিরে একই কথা আসে কিন্তু আমাদের কথা হলো আমরা তো স্বাধীন হইনি। আমরাতো এখনও দেশ বন্দনায় আছি।

প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ।

জীবন বাংলাদেশ আমার, মরণ বাংলাদেশ।

এটাইতো আমাদের সর্বশেষ চেতনা। এখানে কি রাষ্ট্রের কথা আছে? নাগরিকদের কথা আছে? আমরা তো আমাদের অতীত ও বর্তমান নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। সেনাবাহিনীর এক ভদ্রলোক, তিনি একদিকে পল্লীবন্ধু, অপরদিকে নকল কবি। সারাক্ষণ বলতেন ৬৮হাজার গ্রাম বাঁচলে, আমরা বাঁচবো। তো ৬৮হাজার গ্রাম তো বেঁচে আছে। বরং অবারিতভাবে রাস্তা-ঘাট তৈরি হয়ে, ইট পাথরের হাইরাইজ ওঠে, ধূলাবালির হাট-বাজারের পরিবর্তে আধুনিক মার্কেট-মল তৈরি হয়েছে। নদী-নালা, খাল-বিল, জমি-জমা, পুকুর-দিঘী সবকিছু ভরাট হয়ে নতুন নতুন ডিজাইনের বাড়ি-ঘর উঠেছে। আর বাকি যে জমি-জমা, খাল-বিল আছে তা’ প্লাস্টিক বর্জ্য, কেমিক্যাল ও পেস্টিসাইজের অবাধ ব্যবহারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দলিলে সে গ্রামই আছে। আমরা তো অতীতের সনাতন গ্রামের বন্দনাই তো করে এসেছি এতদিন। গ্রাম্য বাংলার স্বপ্ন তো আমরা এই সেদিন থেকে ভুলতে চেষ্টা করছি। আমরা কখনও নগর সভ্যতা তো চাইনি। বরং গত হাজার বছরে নগর সভ্যতার বিপরীত স্বপ্নইতো আমরা দেখে আসছি। নগর বাংলাকে আমরা টাওয়ার বাংলা বলেছি। পল্লী বাংলাকে আমরা খামার বাংলা বলেছি!

কৃষাণ-কৃষাণী, রাখাল-ক্ষেতমজুর, কামার- কুমার, মাঝি-মাল্লা, জেলে-তাঁতি, এসবই তো ছিলো আমাদের স্বপ্নের রাজকুমার ও রাজকুমারী। বড়জোর খড়ের ঘর থেকে বা মাটির ঘর থেকে আমাদের স্বপ্ন ছিলো চৌচালা টিনের ঘর। শপথ করে বলতে পারি জমিদার-তালুকদারদের সৌরম্য অট্টালিকার স্বপ্ন আমরা কখনও দেখিনি। সুতরা যা স্বপ্নে দেখিনি, যা কল্পনা করিনি, যা চাইনি তা আমরা কেন পেলাম না, তা নিয়ে আমরা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা আফসোস করছি। এসবই হলো ভুয়া আফসোস, ভুয়া আশা এবং ভুয়া কল্পনা। স্বপ্ন তো দূরের কথা, মহান আল্লাহর কাছেও আমরা কোনোদিন সিঙ্গাপুরের মতো, থাইল্যান্ডের মতো, মালয়েশিয়ার মতো, ভিয়েতনামের মতো, কম্বোডিয়ার মতো দেশের নাগরিক হতে চেয়েছি? না চাইলে আল্লাহ দিবে কেন? কথায় আছে, না কাঁদলে মা-ও নাকি দুধ দেন না। মোদ্দা কথা হলো, আমরা সবসময় গ্রাম-বাংলার মতো সোনার দেশ চেয়েছি। বাধ্য হয়ে স্বাধীনতা চেয়েছি। বুঝিনি। কখনও রাষ্ট্র চাইনি। রাষ্ট্রের নাগরিক হতে হতে চাইনি। ভুল করে চেয়েছি বলে পাইনি। ৩৬শে পেতে গিয়েও পাইনি। সুতরাং আসুন আগে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করি। তারপর দেশকে রাষ্ট্রে পরিণত করি।

লেখক: প্রবীণ কলামিস্ট।