॥ এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া ॥
০১. সাম্প্রতিক সময়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেয়া এক বক্তব্য নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা ও আলোচনা। আবার এই বক্তব্যটি তিনি দিয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রতিষ্ঠাতা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার জিয়ারতের পর তারই মাজার প্রাঙ্গনের এক সুধী সমাবেশে। মওলানা ভাসানীর মাজার জিয়ারত ও তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যে ইতিবাচক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন তার ভুল বা অসাবধানতাবশত বক্তব্যে সমালোচনার কারণে তা ভেসেই গেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টাঙ্গাইলের এক জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন, তার দলের এই প্রতীক নিয়ে। এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বিএনপির দলীয় এই প্রতীকটি ছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাপের। যা পরবর্তীতে বিএনপির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর অসাবধনার বসত ভুল বক্তব্য উপস্থাপনকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করছেন, কেউ কেউ তার বক্তব্যে ভুলগুলোকে তারই প্রেস উ্ইং এর অজ্ঞতাকে দায়ি করছেন আবার কেউ কেউ তার ভুল বক্তব্যকে সঠিক প্রমাণের জন্য নানা আষাড়ে গল্প তৈরী করে পক্ষে নানা যুক্তি উপস্থাপন করছেন। আবার এক ধরনের জ্ঞান পাপীকেও দেখা যাচ্ছে যারা কিছু পাবার আশায় নানা মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের মধ্যে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সঠিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মুখের লাগাম টেনে ধরতেও ভুলে গেছেন। মওলানা ভাসানীকে ছোট করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকেই ছোট করছেন।
বিজ্ঞজনরা বলে থাকেন, ইতিহাস না জানা অপরাধ নয়, তবে ইতিহাস বিকৃত করা অপরাধ। আর এই অপরাধটি করছেন অনেক জ্ঞান পাপিরা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপ (ভাসানী) “ধানের শীষ” প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। যেখানে মওলানা ভাসানী নিজে অংশগ্রহণ না করলেও তার দলের শীর্ষ নেতা ও দলের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান যাদু মিয়া অংশগ্রহণ করেন এবং নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর রোজ বুধবার ইন্তিকাল করেন। জীবদ্দশায়ই মওলানা ভাসানী ন্যাপের রাজনীতি থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে শরিয়ে নিয়েছিলেন এবং খোদাই খেদমতগার ও হুকুমতে রব্বানীয়া গঠন করেন। তখন ন্যাপের নেতৃত্বে ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবীদ মশিউর রহমান যাদু মিয়া।
তৎকালীন চীফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায় বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে জাগদল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী অংশ ছিল ন্যাপ (ভাসানী) যার নেতৃত্বে ছিলেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া। তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের’ মনোনীত প্রার্থী হিসাবে ধানের শীষ মার্কা নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন।
ছয় দলীয় জোট ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’-এর প্রার্থী হিসেবে সেই নির্বাচনে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও “ধানের শীষ” প্রতীক ব্যবহার করেন। অন্যদিকে (আওয়ামী লীগ, জাতীয় জনতা পার্টি, ন্যাপ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে) বিরোধী দলীয় ঐক্যের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী জেনারেল এম এ জি ওসমানী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে ছিল : ১। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল, ২। মরহুম মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ(ভাসানী), ৩। কাজী জাফরের নেতৃত্বে ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, ৪। শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ৫। মাওলানা আবদুল মতীনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ লেবার পার্টি এবং ৬। বাংলাদেশ তফসিলি ফেডারেশন-এর সমন্বয়ে।
০২. বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ছিল এক অনন্য গণভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি। কৃষক-শ্রমিক নির্ভর এই দলটি স্বাধীনতার আগে ও পরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও স্বাধীনতার পরবর্তী বাস্তবতায় তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ইন্তিকাল করেন। ন্যাপের চেয়ারম্যান মওলানা ভাসানীর ইন্তিকালের ফলে ওই বছরেই ডিসেম্বর মাসেই দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে ন্যাপের সেক্রেটারি জেনারেল মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে চেয়ারম্যান এবং এস,এ,বারি এটিকে মহাসচিব নির্বাচন করা হয়। ১৯৭৮ সালের মার্চ মাসে দলের বর্ধিত সভায় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে ন্যাপের যোগদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ন্যাপের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পূর্বেই জোটের মির্টিং-এ মশিউর রহমান যাদু মিয়া ন্যাপের নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ প্রেসিডেন্ট জিয়াকে উপহার দেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শহীদ জিয়া এই ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত হন। এখানে উল্লেখ্য যে, ন্যাপের বর্ধিত সভায় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যোগদানের বিষয়ে বিরোধিতা করেন তৎকালীন সাংবাদিক -রাজনীতিবিদ, ন্যাপ নেতা আনোয়ার জাহিদ, নুরুর রহমান সহ অনেকেই। তবে সিংহভাগ নেতৃবৃন্দ মশিউর রহমান যাদু মিয়ার সিদ্ধান্তের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যোগদান করেন। ন্যাপের মহাসচিব এস,এ, বারী, এটি, মির্জা গোলাম হাফিজ, আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, খন্দকার দেলওয়ার হোসেন, তরিকুল ইসলাম, সাদেক হোসেন খোকা, চট্টগ্রামের আব্দুল্লাহ আল নোমান, কবির হোসেন প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আলোচনায় একটি বিষয় সামনে চলে এসছে যে, রাজনীতিবিদগণ ক্ষুদ্র স্বার্থে মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে ভুলে যাচ্ছেন ইচ্ছে করেই। বিএনপি গঠনে ও ধানের শীষ প্রতীক বিএনপিকে দেয়া সকল কিছু নিযে নানা আলোচনা চললেও যাদু মিয়ার অবদানকে কেন জানি মনে হচ্ছে মুছেই ফেলতে চাচ্ছে কেউ কেউ। মশিউর রহমান যাদু মিয়া পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৯৬২ এবং ১৯৬৫ সালে সদস্য, ডেপুটি লীডার ছিলেন। মওলানা ভাসানী যখন ন্যাপ এর সভাপতি ছিলেন তখন যাদু মিয়া কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।
০৩. ১৯৭৮ সালের ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। জুনের ৩ তারিখে নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ওই বছরের ১ মার্চ থেকে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়। সেদিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জাষ্টিস আব্দুস সাত্তার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) সহ ৬টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হয়। যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপ এই ফ্রন্টে যোগদান করে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টপ্রার্থী। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ৫টি দলের সমন্বয়ে গঠিত গণঐক্য জোটের প্রার্থী, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী। বিপুল ভোটের ব্যবধানে জিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
এরপর শুরু হল রাজনৈতিক উত্তেজনা। প্রেসিডেন্ট জিয়া চাইলেন ফ্রন্ট বিলুপ্ত করে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করতে। এর প্রতিবাদে ইউনাইটেড পিপলস পার্টির নেতা কাজী জাফর আহমেদ, সাংবাদিক নেতা এনায়েতউল্লাহ খান মিন্টু এবং আরো কয়েকজন নেতা মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করে বিশাল বিশাল জনসভা করে জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করা শুরু করলেন।
সে দু:সময়ে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন যাদু মিয়া। নিজ হাতে গড়া প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে। যাদু মিয়া শুধু ন্যাপের পতাকাই জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেননি, সঙ্গে দিয়েছিলেন নির্বাচনী প্রতীক ‘ধানের শীষ’। ১৯৭৯ সালের ১৮-ই ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি’র নিরঙ্কুশ বিজয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ।
১৯৭৬ সনের ১৭ নভেম্বর মজলুম জননেতা মুকুটহীন সম্রাট হুজুর ভাসানী পার্থিব জীবন থেকে বিদায় নিলেন। হুজুর ভাসানী তাঁর মৃত্যুর আগে যাদু ভাইকে জিয়ার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি বড় দল করার নির্দেশ প্রদান করেন। এর পেছনে একটা কারণ ছিল। জিয়াউর রহমান সেনা প্রধান থাকা অবস্থায় একাধিকবার সন্তোষে হুজুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এর মধ্যে দুইদিন আমি ন্তোষ উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু ওনাদের মধ্যে কি আলোচনা হয়েছে সেটা আমি বলতে পারব না কারণ ওই সময় আমাকে ওখানে থাকতে দেওয়া হয়নি!
এরপর শুরু হয় যাদু ভাইয়ের হুজুর ভাসানীর নির্দেশিত পথে একটি বড় দল গঠনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ঢাকার ডেফোডিল হোটেলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এবং সেখানে যাদু ভাইকে চেয়ারম্যান ও এস এ বারী এটি কে মহাসচিব করে ন্যাপ এর নতুন কমিটি গঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে গঠিত কমিটির আমি সদস্য ছিলাম। এরপর শুরু হয় জিয়া-যাদু বেঠকের পর বৈঠক! এর কিছুদিন বাদে ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে বিচারপতি সায়েম স্বাস্থ্যগত কারণে জেনারেল জিয়ার নিকট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব অর্পণ করে অবসরে চলে যান।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জিয়া জনগণের মতামত গ্রহণের নিমিত্তে ১৯৭৭ সনের ৩০ মে দেশব্যাপী তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে হাঁ-না গণভোট করে বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন। এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর গঠন করেন মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় একটি উপদেষ্টা পরিষদ। এরপর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে যাদু ভাইয়ের উদ্যোগী ভূমিকায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় যাদু ভাইয়ের নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এর নেতৃত্বে জাগো দল, কাজী জাফরের নেতৃত্বে ইউনাইটেড পিপল্স পার্টি, শাহ্ আজিজের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ, মাওলানা মান্নানের নেতৃত্বে লেবার পার্টি ও রসরাজ মন্ডলের নেতৃত্বে তফসিলি সম্প্রদায় পার্টি নিয়ে গঠিত হয় ৬ দলীয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। এখানে বলে রাখা ভালো সেই ফ্রন্ট সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায়ও গঠিত হয়, তার মধ্যে টাঙ্গাইল জেলায় এই ফ্রন্ট এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম ন্যাপ সভাপতি আব্দুর রহমান এবং আমি হামিদুল হক মোহন।
এরপর মাওলানা ভাসানী নির্দেশিত, ন্যাপ চেয়ারম্যান ও ফ্রন্ট নেতা হিসেবে মশিউর রহমান যাদু মিয়া কর্তৃক প্রদেয় ধানের শীষ প্রতীক প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাতে তুলে দেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া সাদরে ধানের শীষ প্রতিক গ্রহণ করেন এবং ধানের শীষ প্রতিক নিয়েই দ্বিতীয়বার ৭৮ সনে ৩ জুন ৬ দলিয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এর পক্ষে ঘোষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, জিয়া প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিচারপতি আব্দুস কে সাত্তার ভাইস প্রেসিডেন্ট, মশিউর রহমানকে সিনিয়ার মিনিষ্টার করে গঠন করেন ৪২ সদস্যের মন্ত্রী পরিষদ।”
০৫. নীলফামারীর ডোমার বহুমুখী হাইস্কুল মাঠে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মশিউর রহমান যাদু মিয়ার উপস্থিতিতেই এক বিশাল জনসভায় বক্তব্যে বলেছিলেন, “আপনাদের সন্তান যাদু মিয়া ধানের শীষ আমাদের উপহার দেওয়ায় তাকে ধন্যবাদ। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের প্রিয় প্রতীক ধানের শীষ। মওলানা ভাসানীর রানিংমেট যাদুমিয়া আজ আমাদের পলিটিকাল গাইড। “ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন ডোমার বিএনপি” নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আবদুল জব্বার, সভায় উপস্থিত ছিলেন নীলফামারী জেলার তৎকালীন সভাপতি আহসান আহমেদ, জেলা যুবদলের সভাপতি জনাব আলমগীর সরকার, ডোমার যুবদলের সভাপতি মুসাব্বের হোসেন মানু, শাহ আজিজুল হক, ডোমার ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাংবাদিক সালেম সুলেরি প্রমুখ।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এই প্রতীকটি দলটির আনুষ্ঠানিক প্রতীকে পরিণত হয়। সম্পর্ক ও বিতর্ক: মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মারা যান, আর বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। মওলানা ভাসানী মূলত ধানের শীষ প্রতীকের ধারক ছিলেন। তার হাত ধরে তারই আর্শিবাদ পুষ্ট মশিউর রহমান যাদু মিয়ার হাত হয়ে জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শীষ আসে। বিএনপি বর্তমানে এই প্রতীকটিকে মওলানা ভাসানী, মশিউর রহমান যাদু মিয়া ও জিয়াউর রহমান-ত্রীয়ের অবদান হিসেবে গণ্য করা উচিত। কাউকে ছোট করতে গিয়ে কাউকে বড় করা যায় না। করা উচিতও নয়।
ইতিহাস কোনো বাগাড়ম্বর বা গালগল্পের বিষয় নয়। এটি তথ্য, প্রমাণ ও রেফারেন্সনির্ভর চর্চার বিষয়। সেই ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে হয় রাজনৈতিক বয়ান। মওলানা ভাসানী কোনো ব্যবহার্য বস্তু নন, যাকে প্রয়োজনে ব্যবহার করে ক্ষমতায় গিয়ে ভুলে যাওয়া হবে। তিনি কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নন। তিনি আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই অনন্য রাজনৈতিক আদর্শকে অন্য কারো ছায়ায় ঢেকে দেওয়া বা বিলীন করে দেখানোর অপচেষ্টা নিঃসন্দেহে ইতিহাস বিকৃতির শামিল। যারা এ ধরনের অপপ্রচার চালায়, তারা হয় রাজনৈতিকভাবে মূর্খ, নতুবা মতলববাজ। দলকানা, চাটুকার ও অসাড় রাজনৈতিক চামচারা-যারা ইতিহাসচর্চা করে না-তারা শুধু দেশের নয়, নিজেদের দলেরও শত্রু। পদের লোভে, স্বার্থের নেশায় এরা সবকিছু বিকিয়ে দিতে দ্বিধা করে না। তাই সতর্ক থাকতে হবে।
লেখক : রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনীতিক বিশ্লেষক।