‘কবে খুলছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’-এমন শিরোনাম থেকে সৃষ্টি হয় কিছু প্রশ্নের। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর খোলার ক্ষেত্রে কি অযথা বিলম্ব ঘটানো হচ্ছে? এখানে কি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা রাজনৈতিক অনীহা কাজ করছে? জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের সাথে জড়িয়ে আছে জাতির আকাক্সক্ষা এবং ছাত্র-জনতার সাহসী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের গৌরবগাঁথা। এমন বাতিঘর উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা মেনে নেবে না দেশের ছাত্র-জনতা। বিষয়টি কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপলব্ধির বাইরে? ২৫ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গণভবন একসময় ছিল ক্ষমতার দম্ভ ও শাসনের কেন্দ্রবিন্দু।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্র-জনতার রক্তে কেনা সেই রাজকীয় বাড়িটিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। জনগণের আশা ছিল, দ্রুতই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোর জীবন্ত দলিল সবার জন্য উন্মুক্ত হবে। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। আজও সাধারণ মানুষের জন্য খোলেনি এ জাদুঘরের মূল ফটক। এ দীর্ঘসূত্রতার কারণ কী? আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নাকি রাজনৈতিক অনীহা? এমন প্রশ্ন থেকে সৃষ্টি হয়েছে উৎকণ্ঠা এবং শঙ্কা।
প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা যায় যে, জাদুঘরটি পরিচালনার আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করেছিল। ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর নীতিগত অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতি ২০২৫ সালের ১৩ নবেম্বর এটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করেন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংশোধনীসহ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল-২০২৬ পাস করা হয়, যা এ প্রকল্পটিকে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো প্রদান করেছে। নতুন এ বিলে জাদুঘরটিকে কেবল একটি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পরিধি আরো বিস্তৃত করা হয়েছে। বিলের বিধান অনুযায়ী, দেশের বিভিন্নস্থানে বিগত সরকারের আমালে গড়ে তোলা গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ এবং যেসব স্থানে জুলাই বিপ্লবের সময় নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়েছে, সেগুলোকে এ মূল জাদুঘরের ‘শাখা জাদুঘর’ হিসেবে সংরক্ষণ করা যাবে। এছাড়া এ জাদুঘরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ করতে ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই এক সরকারি সভায় ৪০ কোটি টাকারও বেশি বাজেটে এ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টেই এটি উদ্বোধনের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সেই সময় পার হয়ে এখন ২০২৬ সাল চললেও জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয়নি।
জাদুঘরটি উদ্বোধনে বিলম্ব ঘটায় সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই আন্দোলনে আহত যোদ্ধারা। তারা বলছেন, ‘এটি অন্তর্বর্তী সরকার থাকাককালীনই উদ্বোধন করা উচিত ছিল, এটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল। আমরা এখনো নতুন সরকারের ওপর আস্থা রাখছি, তবে অতিদ্রুত যেন এর উদ্বোধন হয়।’ উল্লেখ্য, জাদুঘরের উদ্বোধন ঝুলে থাকার পেছনে প্রশাসনের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একজন সিনিয়র আমলার কারসাজিতে সব কাজ বন্ধ রয়েছে। সেই আমলা বিগত সরকারে প্রভাবশালী ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সাবেক এক উপদেষ্টার মতে, সেই আমলার প্ররোচনাতেই জাদুঘর উদ্বোধনে টালবাহানা চলছে। বিএনপি জুলাই অধ্যাদেশ পাস করলেও সেই আমলার কারসাজিতে সবকিছু আটকে আছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সেই উপদেষ্টা। তবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের দায়িত্ব কিন্তু সরকারের ওপরই বর্তায়। আরো বিলম্ব ঘটলে সরকারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।