ইতিহাস বলে শক্তির সাথে যুক্তিও থাকতে হয়, শুধু দম্ভ দিয়ে কাজ হয় না। দম্ভের কাজ তেমন টেকসই হয় না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচার-আচরণকে কেন্দ্র করে কথাগুলো আবার উঠে আসছে। ২৬ এপ্রিল পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে, ‘স্পেনকে বহিষ্কারে আমেরিকার প্রস্তাব উড়িয়ে দিল ন্যাটো’। এমন শিরোনাম আলোচনার দাবি রাখে বটে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে আগ্রাসনে সহযোগিতা না করায় উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোভুক্ত মিত্রদের বিরুদ্ধে শাস্তির কথা ভাবছে আমেরিকা। একই সঙ্গে স্পেনকে জোট থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগণের অভ্যন্তরীণ ইমেইল বার্তার বরাত দিয়ে শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানায়। ইমেইল বার্তায় সংযুক্ত পেন্টাগণের শীর্ষ নীতিনির্ধারণ বিষয়ক উপদেষ্টা এলব্রিজ কোলবির প্রস্তুতকৃত নোটে দেখা যায়, ইরানে আগ্রাসনের সময় জোটভুক্ত কিছু দেশ যুদ্ধের জন্য আমেরিকাকে যথাযথ সহযোগিতা করতে অনাগ্রহ প্রকাশ বা প্রত্যাখ্যান করেছে। এ নিয়ে ওয়াশিংটন গভীরভাবে হতাশ। এর জন্য ‘বৈরী’ দেশগুলোকে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ বা মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান থেকে অবনমনের বিষয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করায় ন্যাটো জোট থেকে স্পেনকে বের করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কি পন্থায় তা করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি নোটে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোভুক্ত মিত্রদের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে আসছেন। ইরানে আগ্রাসনের পর আরো জোরেশোরে এ বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন তিনি। এছাড়া চলতি এপ্রিল মাসের শুরুতে ন্যাটো জোট থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। তবে পেন্টাগণের ইমেইলে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের আগ্রাসন শুরুর পর আমেরিকা-ইসরাইলকে সহযোগিতা করতে অনাগ্রহ ও অস্বীকৃতি জানায় ন্যাটোভুক্ত বিভিন্ন দেশ। এরমধ্যে স্পেন ইরান যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করে। ইরান আগ্রাসনকে অবৈধ বলে মন্তব্য করে মাদ্রিদ। আমেরিকার জন্য নিজের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারকেও নিষিদ্ধ করে স্পেন। এতে ভীষণ চটে যান ট্রাম্প। ফলে দাম্ভিক ট্রাম্প এখন চাইছেন স্পেনকে যেন ন্যাটোজোট থেকে বাদ দেওয়া হয়।
ট্রাম্প হয়তো ভেবেছিলেন, তার চাওয়াকে মান্য করা হবে। কিন্তু ন্যটোর পক্ষ থেকে বলা হয়, জোটভুক্ত কোনো সদস্য দেশকে বহিষ্কারের নিয়ম নেই। বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসিকে ন্যাটোর এক কর্মকর্তা জানান, জোটের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত কোনো দেশের সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের বিধান নেই। এদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ন্যাটো থেকে মাদ্রিদকে বহিষ্কারে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনায় উদ্বিগ্ন নন তিনি। সাইপ্রাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত নেতাদের সম্মেলনে অংশগ্রহণরত স্পেনীয় প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ইমেইলে কাজ করি না। আনুষ্ঠানিক নথি ও সরকারি অবস্থান থেকে আমরা কাজ করি। স্পেন সরকারের অবস্থান স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক বৈধতার কাঠামোর মধ্যে জোটকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।’ পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘ন্যাটোর মধ্যে নির্ভরযোগ্য সদস্য স্পেন। আমি একদমই চিন্তিত নই।’ স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিবেচনা করে দেখার মতো। তিনি আন্তর্জাতিক বৈধতার কাঠামোর মধ্যে কাজ করার কথা বললেন। তার কথায় শেখার মত বিষয় রয়েছে ট্রাম্পের জন্য। আর ন্যাটো তো দাম্ভিক ট্রাম্পের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করলো। আসলে শক্তি দিয়ে সবকিছু হয় না, যুক্তি ও নৈতিকতার বিষয়গুলোও উপলব্ধি করতে হয়। ইরানে আগ্রাসন চালিয়ে কোনো লাভ হলো কি আমেরিকার? ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু স্থূলবুদ্ধির দাম্ভিক ট্রাম্পকে ফাঁদে ফেলে তার ‘গ্রেটার ইসরাইল’ স্বপ্ন পূরণ করতে চাইছে। বিষয়টি এখন মার্কিন জনগণ উপলব্ধি করতে পারছে। তারা বিক্ষোভও করছেন। তবে ট্রাম্প তার ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শুধু নিজেকে নয়, যুক্তরাষ্ট্রকেও ছোট করে চলেছেন।