সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন। সাংবাদিকরা সেই প্রশ্নগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন করেন, সাংাদিকরা কতটা স্বাধীন কিংবা গণমাধ্যম কি সেলফ সেন্সরে ক্ষতিগ্রস্ত, এর জবাব কেমন হবে? সম্পাদকরা এর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশ জার্লালিজম কনফারেন্সে। উল্লেখ্য, শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স-২০২৬’-এর উদ্বোধনী দিনে সম্পাদকরা কথা বলেন। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডান-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, গণমাধ্যম প্রতষ্ঠানের মালিকরা ‘সেলফ সেন্সর’-এ অভ্যস্ত হয়ে পড়লে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকে থাকতে পারবে না। তিনি বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল কাজই হলো বেসরকারি খাত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উন্মোচন করা। এটি ‘এক ধরনের জনসেবা’। এর বিপরীতে সেলফ সেন্সরের প্রবণতা সাংবাদিকতার জন্য এক ভয়ানক পরিণতি ডেনে আনবে। তিনি প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ‘সেলফ সেন্সর’ অনেক বেশি বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেন। ডন সম্পাদক বলেন, প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকলে জনগণকে বলা যায়, সামরিক শাসন বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে কিছু প্রকাশ করা যাচ্ছে না। কিন্তু সেলফ সেন্সর-এর ক্ষেত্রে এটুকু বলারও উপায় থাকে না। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন আছে অথচ তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। এই অদৃশ্য চাপই সবচেয়ে কঠিন সমস্যা। একটি সংবাদপত্রের টিকে থাকা এর সম্পাদকীয় টিমের স্বায়ত্তশাসন ও সততার ওপর নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং প্রকাশকদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি আপনার সম্পাদক ও সহকর্মীদের বিশ্বাস করতে না পারেন, তাহলে একটি মিডিয়া হাউস কখনোই সফল হতে পারবে না।

অনুসন্ধান এবং মুনাফা প্রসঙ্গে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন ডন সম্পাদক জাফর আব্বাস। তিনি মনে করেন, অনুসন্ধানের বদলে মুনাফার দিকে ঝুঁকলে সাংবাদিকতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডন অনেক বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে। তার জন্য পত্রিকাটিকে মাশুলও দিতে হয়েছে। পাকিস্তানের অন্যতম একজন সাহসী সাংবাদিক এক বড় আবাসন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতিবেদন করেছিলেন। এর জবাবে সেই ব্যবসায়ী অন্যসব পত্রিকায় ডনের বিরুদ্ধে পূর্ণ পাতার বিজ্ঞাপন দেন। দুঃখজনকভাবে অন্য পত্রিকাগুলো অর্থের লোভে সেই বিজ্ঞাপন ছাপতে রাজি হয়ে যায়। বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তান-সবখানেই অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এখন অনুসন্ধানের বদলে মুনাফার দিকে ঝুঁকছে। এই প্রবণতা সাংবাদিকতার অস্তিত্বতে বিপন্ন করবে। কানাডার গণমাধ্যম টরন্টো স্টার-এর সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতা। গভীর বিশ্লেষণ, মন্তব্যের পাশাপাশি অনুসন্ধানী-সাংবাদিকতাই একটি গণমাধ্যমকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তোলে। এ ধরনের প্রতিবেদন করতে শুধু সাংবাদিকের সাহস নয়-সম্পাদক, মালিক ও আইনজীবীর অটল সমর্থনও দরকার।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সবাই কথা বলেন, তবে স্বার্থে আঘাত লাগলে দেখা যায় ভিন্নরূপ। তখন সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের ওপর নেমে আসে আঘাত। এ আঘাত কখনো আসে সরকার থেকে, কখনো রাজনৈতিক মহল থেকে, কখনো বা করপোরেট হাউস থেকে। তবে আরও চিত্র আছে। বাস্তব বিষয় হলো, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ কিংবা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকের একার ভূমিকার পাশে অটল সমর্থন প্রয়োজন সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান, মালিক ও আইনীবীর। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক ইউনিয়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু সাংবাদিক ইউনিয়ন এখন সেই অবস্থানে আছে কিনা সেই প্রশ্নও উঠছে। ডন সম্পাদক সততা তথা নৈতিকতার প্রসঙ্গটিও ইত্থাপন করেছেন। এই বিষয়টি এখন সংবাদপত্র জগতে কাক্ষিত পর্যায়ে আছে কী?