বিএনপি অভ্যুথান পরবর্তী জনরায়ের সরকার। দুই তৃতিয়াংশ ম্যান্ডেট নিয়ে তারা সরকার গঠন করেছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুথ্যান ছিলো স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সবচয়ে বড় গণবিস্ফোরণ। সে কারণে নতুন নির্বাচিত সরকার বিগত দিনের সরকার ব্যবস্থার মত হবে না এটাই স্বাভাবিকভাবে সবাই চাইতে পারে।
অগ্নির্গভ সময় পেরিয়ে নতুন এই সরকারে শুরুটা কেমন হলো সরকার গঠনের তিন মাসে সেটাই মুল্যায়ন করতে চাই। যে সময়টাতে নুতুন এই নির্বাচিত সরকার এলো, তার পরপরই দেশ দুটি বড় বৈশ্বিক ও প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জে পড়লো। যার একটি হলো ইরান-মার্কিন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট অপরটি হামের প্রাদুর্ভাব যা এখনো চলমান। তবে জনগণ হতাশার সাথে লক্ষ্য করলো এনিয়ে সরকার তার কোন কারিশমা দেখাতে পারেনি।
প্রথমে আসি জ্বালানি ইস্যু নিয়ে, আমরা দেখলাম জ্বালানি সংকটে দিনের পর দিন দীর্ঘ লাইন, বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ মজুদদারদের কাছ থেকে হাজার লিটার তেল জব্দ করা ইত্যাদি । এর কিছুদিন পর যখন জ্বালানি সমস্যা নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলের বিশেষ কমিটি করা হলো তার পরপরই কিছুটা ভোজবাজির মতই দীর্ঘলাইন রইলো না। কেউ কেউ বলেন বৈশ্বিক সংকট সমাধানের দিকে যাওয়ায় এটা হলো, কিন্তু আসলেই কি তা সত্য? এই ঘটনা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই মজুদদারদের আশ্রয় প্রশ্রয়ের কি ইঙ্গিত দেয় না?
জাতীয় দুর্যোগের পর্যায়ে চলে যাওয়া হাম বিষয়ে সরকারের তৎপরাতার চেয়ে ইন্টেরিম সরকারের হামের টিকা নিয়ে অবহেলার বিষয়টি বেশি আলোচিত হচ্ছে। অথচ সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য থেকে জানাযায়, হামে মৃত্যুবরণ করা শিশুদের ৭০ ভাগই ৬ মাসের কম বয়সি অর্থাৎ হামের টিকা নেয়ার সময় তাদের হয়নি। এক্ষেত্রে রোগে আক্রান্তদের জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ ও জরুরী পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন বেশি ছিলো। একজন হামের রোগীর স্বজনের সাথে কথা বলে জানলাম, জেলা হাসপাতালে তার হাম হয়েছে কিনা তা নির্ণয় করা সম্ভব করা হয়নি। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেলে আনা হলে তারা এটাকে হামরোগ হিসেবে চিহ্নিত করে মহাখালি হাসপাতালে পাঠায়। এই হলো সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অথচ ১২ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল চলা সংসদের প্রথম অধিবেশনে কতদিন এই বিষয়ে কথা বলা হয়েছে ?
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে সরকারী দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ না করায় নয়া বন্দোবস্তের যে কথা অভ্যুথান পরবর্তী সময়ে বারবার বলা হচ্ছিল তা অনিশ্চিত হয়ে গেল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের জন্য শুরুতেই বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে, জনআস্থা ধরে রাখা। তার ওপর আবার গণভোট ইস্যুটা সর্বোচ্চ আদালতে নিয়ে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী যারা হ্যাঁ-এর পক্ষে মতামত দিলো তাদের হতাশ করেছে। যদিও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিক।
নির্বাচনের আগে বিএনপির বড় অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে যেগুলো ছিলো- ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও খাল খননের মতো কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। তবে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে জানিয়েছে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। মব (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণ) ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় ৬৭০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালনার চেয়ে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আইন ও সংবিধান বিষয়ে বেশি সময় ব্যয় করছেন। একারণে তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বেশি মনোযোগী হতে পারছেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ইডেন, তিতুমীর কলেজের ছাত্রীরা, ছাত্রদলের বিরূদ্ধে হলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করছে। ছোট ইস্যু থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হলেও সাধারণ মানুষ বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছে না, কারণ হল হোস্টেলগুলোতে রাজনৈতিক আধিপত্যের যে প্রথা বিগত ১৭ বছর ধরে চলছিলো সেটা আর ফিরে আসুক কেউই চায় না।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যার মধ্যে রয়েছে ইন্টেরিম সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ এবং সিটি করপোরেশনগুলোতে দলের নেতাদের প্রশাসক বসানো নিয়েও সমালোচনা আছে। গুরুত্বপুর্ণ পদে দলীয়করণের এসব সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে না।
ইন্টেরিম সরকারে নেয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ- জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিচারব্যবস্থাসংক্রান্ত কিছু সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য ও সংস্কার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সরকার গঠনের শুরুতেই গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু গুম প্রতিরোধবিষয়ক অধ্যাদেশটি নির্ধারিত সময়ে সংসদে অনুমোদন করেনি সরকার। ফলে গুমের তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠনের পরিবর্তে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিই বহাল থাকবেÑ এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী ১২ এপ্রিল বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন, দুদক সংশোধন অধ্যাদেশসহ ১৬ অধ্যাদেশ আরও যাচাই-বাছাই করে সংসদে নতুন বিল হিসেবে আনা হবে। তবে কোন বিল কবে আনা হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান ১৯ এপ্রিল ঢাকায় এক আলোচনায় বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম কিছুদিনের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে, পুরোনো বন্দোবস্তেরই অনুসরণ চলছে। রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, জনমনে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে বিএনপি সংস্কারের পক্ষে নয়। গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত না করার বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে দেখা হবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। বিরোধী দলগুলো গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে। তবে এব্যাপারে বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি কতটুকু চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে আর তা জনগণের প্রত্যাশা অনুযাযায়ী হচ্ছে কিনা সেপ্রশ্ন রয়েই যায়।
সামনে জাতীয় বাজেট; অথচ রাজস্ব আহরণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দুই দিকেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যস¦ত্বভোগীর কারণে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতিতে। একই সাথে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে অস্থিরতা মধ্যম আয়ের মানুষদের ভাবিয়ে তুলছে।
কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের স্বপ্নদেখা মানুষগুলো চব্বিশে পথে নেমেছিলো আর শোষিত না হওয়ার আশায়, ভেবেছিলো দীর্ঘদিনের নির্যাতনের শিকার দেশের দুটি বড় দল বিএনপি জামায়াত ফ্যাসিবাদী কাঠামো চিরতরে বিলুপ্ত করবে। কিন্তু সংশয় কাটেনি। কথায় বলে “Morning shows the day” সরকার এই প্রথম তিনমাসে পরিবর্তনের ছাপ রাখতে খানিকটা অসফল, যাতে জনমনে সংশয় কেটে যাবে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করবে আর কোন সরকার এতটা ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে না যেন তাকে আরেকবার রাস্তায় নেমে তাড়াতে হয়।