আজকে সূর্য উদয় আর সুর্যাস্তের মধ্য দিয়ে বিএনপি তথা তারেক রহমান সরকারের তিন মাস পূর্ণ হচ্ছে। আজ থেকে তিন মাস আগে ফেব্রুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি সরকারের শপথ হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি সিলেটে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তার আড়াই মাসের সরকারকে শিশু সরকার বললেও দেশের অধিকাংশ জনগণ এই সময়ের মধ্যেই সরকারের আমলনামা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা শুরু করে দিয়েছে। মাঠে, ময়দানে, চায়ের দোকানে, বন্ধু-বান্ধবের আড্ডায় চলছে আলাপ-আলোচনা। সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন হচ্ছে নানা দিক থেকে নানা আঙ্গিকে। মোটাদাগে সরকারের তিনটি দিক নিয়ে সবচেয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। প্রথমত খাল খনন, দ্বিতীয়ত কার্ড বিতরণ এবং তৃতীয়ত প্রশাসনসহ সবখানে দলীয়করণ নিয়ে কথা হচ্ছে দেদারছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে জ¦ালানি তেল নিয়ে তেলেসমাতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চাঁদাবাজি দুর্নীতির কথাও বাদ যাচ্ছে না চায়ের টেবিল কিংবা আলোচনার টেবিলে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, তারেক রহমান শাসন কার্য পরিচালনায় তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা মরহুম খালেদা জিয়াকে অনুসরণ করছেন। এজন্য শুরুতেই তিনি সারাদেশে বাবা জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচীতে হাত দিয়েছেন। মা খালেদা জিয়ার উন্নয়ন কর্মসূচীগুলো আবারো চালু করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মেয়েদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশেষ তৎপর দেখা যায় তারেক রহমানকে। আরও একধাপ এগিয়ে বললে দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসনে থেকে দেখে আসা পশ্চিমা দেশ ইংল্যাণ্ডসহ উন্নত দেশগুলোর মতো সংকট মোকাবেলায় তিনি দেশের নাগরিকদের জন্য যে কার্ড প্রথা চালু করেছেন। তাতে অবশ্য নারীদেরকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কল্যাণরাষ্ট্র পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ ‘ফ্যামিলি কার্ড’। অবশ্য নির্বাচনের আগেই তিনি সিলেটে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশের ৪ কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া হবে ( সূত্র ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ বাসস)। দলের ইশতেহারেও এই কার্ডকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে চার কোটি পরিবারকে ধাপে ধাপে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। তারেক রহমান বলেন, ‘একবারে সবাইকে দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে ধীরে ধীরে সব পরিবারের কাছে পৌঁছানোর। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবার মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা পাবে, যা নগদ অথবা প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য ব্যবহার করা যাবে। ফ্যামেলি কার্ড উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী কৃষক কার্ড, এলপিজি কার্ড, প্রবাসী কার্ডসহ আরও ৮টি কার্ড বিতরণের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, এলপিজি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড, ক্রীড়া কার্ড,স্বাস্থ্য কার্ড, শ্রমিক কার্ড এবং ছাত্র/যুব কার্ড। এর বাইরে রয়েছে জ¦ালানি তেল সমস্যা মোকাবেলায় ফুয়েল কার্ড।
এর মধ্যে ফ্যামিলি বা পরিবার কার্ড পরিবারের নারী প্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হয়। প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়। সাশ্রয়ী মূল্যে চাল, ডাল, তেল ও চিনি কেনার সুবিধা পাওয়া যায়। এলপিজি কার্ড চালু করা হয়েছে রান্নার কষ্ট লাঘবে নারীদের জন্য। এর মাধ্যমে কার্ডধারীরা ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার পাবেন। কৃষক কার্ড মূলত কৃষকদের কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা এবং সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহ প্রদান এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিশেষ সুবিধা দিতে এই কার্ডের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রীড়া কার্ডে খেলোয়াড়দের সহায়তা ও ক্রীড়া খাতের উন্নয়নের জন্য বিশেষ কার্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য কার্ড সম্পর্কে বলা হচ্ছে নাগরিকদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে এই হেলথ কার্ড ব্যবহৃত হবে। শ্রমিক কার্ডে মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণ এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে এই কার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। ছাত্র/যুব কার্ড: শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি এবং উচ্চশিক্ষা সহায়তার জন্য এই কার্ডটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারে গিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল খনন কর্মসূচী শুরু করেন। দিনাজপুরে গিয়ে প্রথম বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতো কোদাল দিয়ে খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই দিনে সারাদেশে খাল খনন শুরু হয়। বলা হচ্ছে, সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে এই কর্মসূচির মাধ্যমে। এই খাল খননের মাধ্যমে দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়বে। লাভবান হবে এদেশের কৃষক সমাজ। অবশ্য কৃষকদের প্রণোদনা হিসেবে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করেছেন তারেক রহমান।
তিনি বগুড়াতে গিয়ে কৃষকের হাতে কৃষককার্ড বিতরণের উদ্বোধন করেন। আর ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ আসনে আনুষ্ঠানিক ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি একে একে বেশ কয়েকটি সেবামূলক কার্ডের কাজ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলছেন। এরমধ্যে রয়েছে-কৃষক কার্ড, ক্রীড়া কার্ড, ফ্রিল্যান্সার কার্ড, ই-হেলথ কার্ড, এলপিজি কার্ড। এর বাইরে ইতোমধ্যে সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ফুয়েল কার্ড বা ফুয়েল পাস চালু করেছে।
সরকার প্রধান জানিয়েছেন, দেশের সব গৃহিনী পর্যায়ক্রমে এই কার্ড পাবেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে- নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। পরিবারের গৃহিণী বা নারী সদস্যদের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তাও পাবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
গত তিন মাসের শাসনে সরকার যে কাজটি সূচারুরূপে করেছে তা হলো প্রশাসনসহ সবখানে দলীয়করণ। সরকার ক্ষমতাগ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সুলতান এইচ মনসুরকে মব সৃষ্টি করে তাড়িয়ে দেন। এরপর দেশের সব সিটি কর্পোরেশন দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসিয়ে দেন। প্রতিটি জেলা পরিষদেও নিজেদের লোক বসিয়ে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজেদের দলীয় পদধারী শিক্ষকদের ভিসি পদে নিয়োগ দিয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিজম পালানোর পর ক্ষমতায় বসা সরকারের এই কর্মকাণ্ডগুলো ভাল চোখে দেখেনি কেউ। সমালোচকরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ ফ্যাসিজম কায়েম করতে যে কায়দায় সবখানে দলীয় লোক বসিয়ে বিরোধীপক্ষকে দমন করেছিল; একই কায়দায়, একইপথে বিএনপি সরকারও হাঁটছে।
এই পথ মূলত ফ্যাসিজমের পথ। তারা বলছেন, বৈষম্যহীন সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২০২৪ইং সালের জুলাই মাসে দেশের ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমেছিল। দেশ থেকে ফ্যাসিজমকে বিদায় জানিয়েছিল। উই ওয়ান্ট জাস্টিস দাবিতে রাজপথ কাঁপিয়েছিল জনতা। বর্তমান সরকারকে সে কথা ভুলে গেলে চলবে না।
নির্বাচনের আগে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে মোটাদাগে ৯টি আশ্বাস দিয়েছিল জনগণকে। ইশতেহারের প্রথম ধাপ ছিল প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
ইশতেহারের দ্বিতীয় ধাপ ছিল কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা।
তৃতীয়ত দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা। চতূর্থত আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা। পঞ্চমত তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা।
ষষ্ঠত ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা। সপ্তমত পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যামে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী- খালখনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা। অষ্টমত ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা।
এবং শেষ দফায় বলা হয়, ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন, ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা।
বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপির কিছু কাজ ইতিবাচক হলেও বেশ কিছু কাজ ইতিমধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এরমধ্যে জুলাই আন্দোলনকে অবমূল্যায়ন, সবখানে দলীয়করণ, সিন্ডিকেট করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের পুনর্বাসন এবং ফ্যাসিবাদী কায়দায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ। সরকারের পক্ষ থেকে এগুলোর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে জনগণ কি সিদ্ধান্ত নেয় তা এখন কেবল দেখার অপেক্ষা।