মোঃ সুজন মিয়া

লালমনিরহাট সদর

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিলÑদ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ হবে, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সরকারের প্রথম তিন মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও বাস্তব অর্জনের তুলনায় ব্যর্থতার আলোচনা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে সামনে এসেছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন ঘোষণা ও অভিযান পরিচালনা করলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার কার্যকর প্রভাব খুব একটা দেখা যায়নি। চাল, ডাল, তেল, সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম চাপে রয়েছে।

ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙার ব্যাপারে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও বাস্তবে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

বেকারত্ব সমস্যাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ সমাজ নতুন কর্মসংস্থানের আশায় থাকলেও প্রথম তিন মাসে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা হতাশা বাড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ এখনও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। কর্মসংস্থানের পরিবর্তে নানা আশ্বাস ও পরিকল্পনার কথাই বেশি শোনা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও সহিংসতাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চললেও জনগণের মধ্যে কাক্সিক্ষত নিরাপত্তাবোধ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন।

প্রশাসনে দুর্নীতি ও অনিয়ম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার এখনো দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে পারেনি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষ, দুর্ভোগ ও ধীরগতির অভিযোগ আগের মতোই রয়েছে। ডিজিটাল সেবার কথা বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে এখনও দালালচক্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও সরকারের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ সংকট ও চিকিৎসক উপস্থিতির সমস্যা এখনও বিদ্যমান। গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ এখনো কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকার এখনো সুস্পষ্ট সাফল্যের বার্তা দিতে পারেনি। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির নানা আলোচনা থাকলেও বাস্তবে বড় ধরনের অগ্রগতি চোখে পড়েনি। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

তবে এ কথাও সত্য, মাত্র তিন মাসে একটি সরকারের সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট রাতারাতি দূর করা কঠিন। কিন্তু জনগণ সরকারের কাছ থেকে অন্তত কার্যকর উদ্যোগ ও বাস্তব পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রত্যাশা করেছিল। সেই জায়গায় সরকার এখনো মানুষের আস্থা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি।

সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের প্রথম তিন মাস ছিল নানা প্রতিশ্রুতি, উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতার মিশ্র সময়। তবে ইতিবাচক অর্জনের তুলনায় ব্যর্থতা, দুর্বলতা এবং বাস্তবায়ন সংকটই বেশি আলোচিত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার আগামী দিনগুলোতে সমালোচনাগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কতটা সফল হয়।