বাংলাদেশে দীর্ঘ ১৭ বছর পর জনগণের আত্মত্যাগ ও আন্দোলনের মাধ্যমে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৩তম সরকার এবং ১১তম প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণকালে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে সামনে রেখে ১০০ দিন ও ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে। এই পরিকল্পনায় ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বেকারত্ব দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট বিরোধী অভিযান, প্রশাসনিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং পররাষ্ট্রনীতির নতুন রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। জনগণও নতুন সরকারের কাছে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল।

তবে সরকার গঠনের পরপরই বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে সরকার পররাষ্ট্র বিষয়ে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কাক্সিক্ষতভাবে এগিয়ে নিতে পারেনি। এর প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বিশেষ করে পেট্রোল পাম্প, জ্বালানি আমদানি এবং বিদ্যুৎ খাতে চাপ বৃদ্ধি পায়। বিদ্যুৎ খাতে মাত্র তিন মাসে প্রায় ১৮ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।এই ভর্তুকির বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের উপরই প্রভাব ফেলছে।

যদি বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।

এছাড়া বর্তমান সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, চুরি-ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স অনুযায়ী, ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৯তম থেকে ছয় ধাপ এগিয়ে ৮৩তম হয়েছে।এই সূচক অপরাধমূলক কার্যক্রমের সক্রিয়তা নির্দেশ করে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর আইন প্রয়োগ ও অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা মাঝারি ধরনের হলেও দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংক খাতকে তারল্য সংকট থেকে বের করে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান নমিনাল জিডিপিতে ৩৩তম বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে। তবে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয় কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। দেশের অনেক মানুষ এখনো আয়কর দিচ্ছে না, যার ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একদিকে কিছু জনগোষ্ঠীর উপর অর্থনৈতিক চাপ কমছে, অন্যদিকে আরেক অংশের উপর চাপ বাড়ছে।

তবে আশার বিষয় হলো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে,যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক। জনগণের প্রত্যাশা, সরকার বিরোধীদল ও সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কৌশলগতভাবে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।