ক্ষমতা গ্রহণের পর তিন মাসে বিএনপি সরকার কূটনৈতিক অঙ্গনে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখাতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় আসা সরকারটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে কিছুটা সফল হলেও, দ্বিপক্ষীয় জটিলতায় এখনো বড় কোনো ব্রেকথ্রু দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে আমেরিকা, চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোকে সরকার বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে নতুন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে কিন্তু এইসব বিষয় এখনও দৃশ্যমান হয়নি। তবে ব্যর্থতার দিকও কম নয়। তিস্তা চুক্তি ও সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও কার্যকর সাফল্য আসেনি। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ও জ¦ালানি সংকট নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, এইসব নিয়ে ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে চলছে নানান বিশ্লেষণ। এদিকে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল পশ্চিমা বিশ্বের আস্থা পুনরুদ্ধার। বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সক্রিয় তৎপরতা দেখা গেছে। সেই লক্ষে পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম আমেরিকা সফরে রয়েছেন। চলতি মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের একটি চুক্তিও হয়েছে। এছাড়াও ভারতের সাথে সীমান্ত হত্যা, ভিসা জটিলতা ও বাণিজ্য বৈষম্যের বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি স্বস্তির পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানান, একটা নতুন সরকারের জন্য তিন মাস খুবই অল্প সময়। এই অল্প সময়ে সরকার কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে সক্ষম হলেও এখনো বড় কোনো কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তাদের মতে, স্থিতিশীল অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া টেকসই কূটনৈতিক অর্জন সম্ভব নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র আরও বলছে, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ কমাতে সরকার একাধিক কূটনৈতিক বৈঠক করেছে। বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপও বেড়েছে।
কূটনৈতিক সাফল্যের খতিয়ান: পশ্চিমা বিশ্ব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার বেশ তৎপর। মধ্যপ্রাচ্যসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আস্থা ফেরানো এবং বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা গতিশীলতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা ইতিবাচক। অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের মতে, “প্রথম তিন মাসে সরকার সম্পর্ক মেরামতে সময় নিয়েছে। তবে ভারতের সাথে অমীমাংসিত ইস্যু এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি সামাল দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।”
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো: নজরুল ইসলাম বলেন, নতুন সরকার শুরুতেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুস্পর্ক বাড়াতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে এটা নতুন সরকারের জন্য তিন মাস খুবই কম সময়। নতুন সরকার আমেরিকা ও চীনের সাথে শুরু থেকেই সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কৌতূহল ছিল সবচেয়ে বেশি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ ভারতের সাথে ন্যায্য দাবিগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে আরও তৎপর হতে হবে। তবে বিশ্লেষক মনে করেন, এখনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তা বা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দৃশ্যমান হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রথম তিন মাসে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বেড়েছে। বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সীমান্ত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তিস্তা চুক্তি ও ফারাক্কা চুক্তির নবায়র নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় কূটনৈতিক অর্জন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শাহাবুল হক মনে করেন, “দুই দেশই সম্পর্কের নতুন সূচনা চায়। কিন্তু আস্থার জায়গা শক্তিশালী করতে হলে পুরোনো সমস্যাগুলোর বাস্তব সমাধান প্রয়োজন।”
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি: ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বিএনপি সরকার চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ইঙ্গিত দিয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় চীনা বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একজন সাবেক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে আছে, যেখানে চীন ও পশ্চিমাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক দক্ষতা।”
রোহিঙ্গা সংকটের অগ্রগতি নেই: নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো রোহিঙ্গা সংকট। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসন কার্যকরভাবে শুরু হয়নি। বার্মার সাথে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক মহলে নতুন সরকার বিষয়টি জোরালোভাবে তুললেও এখনো দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার নিয়ে উদ্বেগ: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে শ্রমবাজার নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকার শ্রমবাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিলেও নতুন বড় কোনো সমঝোতা এখনো হয়নি। প্রবাসী কল্যাণ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
ভারতের সম্পর্কের প্রধান ৩টি সংকট:
১. রাজনৈতিক আস্থার সংকট: দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা বিগত সরকারের সাথে দিল্লির যে ‘বিশেষ’ সখ্য ছিল, বর্তমান সরকারের আমলে সেখানে এক ধরনের শূন্যতা ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বিবৃতি প্রদান বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. সীমান্ত হত্যা ও অমীমাংসিত পানি বণ্টন: বিগত বছরগুলোতে সম্পর্ককে ‘সোনালী অধ্যায়’ বলা হলেও সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নিধন এবং তিস্তা চুক্তি না হওয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে দিল্লির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জাঁতাকলে তিস্তা আটকে থাকাকে বাংলাদেশের মানুষ আর অজুহাত হিসেবে মানতে নারাজ।
৩. নিরাপত্তা ও উগ্রবাদ নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ: বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো আবার সক্রিয় হতে পারে, এমন একটি নিরাপত্তা ভীতি দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে কাজ করছে। এটি দুই দেশের আস্থার পথে বড় বাধা।
ভারতের সাথে সংকট নিরসনের ৪টি কার্যকর উপায়: হাসিনা ইস্যুর সমাধান: ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে একটি সম্মানজনক সমাধানে আসতে হবে। তাকে ব্যবহার করে ভারত থেকে কোনো রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে।
সীমান্তে জিরো কিলিং নিশ্চিত করা: সীমান্ত হত্যাকে শূন্যে নামিয়ে আনতে ভারতকে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ না হলে জনমানুষের ক্ষোভ প্রশমন সম্ভব নয়।
একতরফা নির্ভরতা বনাম পারস্পরিক স্বার্থ: ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি সুবিধা ভারত যেভাবে ভোগ করছে, বিনিময়ে নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে করিডোর সুবিধা এবং তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। একে ‘উইন-উইন’ মডেলে সাজাতে হবে।
পিপল টু পিপল কানেক্টিভিটি: ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় তকমা না দিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা এমন যে কেউ কাউকে এড়িয়ে চলতে পারবে না। দিল্লির উচিত ‘সরকার বনাম সরকার’ সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ‘রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র’ এবং ‘মানুষ বনাম মানুষ’ সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া। বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের দেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।