প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী
সাবেক উপাধ্যক্ষ
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ
দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার সমর্থিত ১৪ দলের বাইরে সকল বিরোধী দল- বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। গুম-খুন, ফাঁসি, জেল-জুলুম নানা অত্যাচার-নির্যাতন শেষে একদল শিক্ষার্থীর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার একাত্মতা ঘোষণার মাধ্যমে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে অনেক প্রত্যাশা ছিল। তারা চেয়েছিল এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। তাদের স্লোগান ছিল, We want Justice’। মানুষ যখন সীমালঙ্ঘন করে তখন আল্লাহপাক মজলুমের পক্ষ নিয়ে জালেমকে শক্তভাবে ধরেন। আল্লাহপাকের বাণী, ‘আমি সংকল্প করেছিলাম, পৃথিবীতে যাদেরকে লাঞ্ছিত করে রাখা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবো, তাদের নেতৃত্ব দান করবো, তাদের উত্তরাধিকার করবো এবং পৃথিবীতে তাদের কর্তৃত্ব দান করবো’- সূরা ক্বাসাস ৫-৬।
হ্যাঁ, আল্লাহপাক তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। ছাত্র-জনতা ফ্যাসিবাদ মুক্ত দেশ পেয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পালিয়ে যাওয়ার পর দেশ পরিচালনার জন্য ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। ফ্যাসিবাদ আগমনের পথ রুদ্ধ করা ও জনবান্ধব সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ড. ইউনূসের সরকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের লক্ষ্যে অনেকগুলো কমিশন গঠন করেন। কমিশনসমূহের সুপারিশ নিয়ে সমঝোতায় উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। সকল রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজ সবমিলে জুলাই সনদ প্রণীত হয়। জুলাই সনদে সকল রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরের পর সেটি রাষ্ট্রীয় দলিলে পরিণত হয়। জামায়াতসহ অন্যান্য দল প্রথমে গণভোট অনুষ্ঠানের দাবি জানালেও বিএনপির চাওয়ার প্রেক্ষিতে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিন অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই বিপ্লবকে ধারণকারী বিএনপিসহ সবাই গণভোটের পক্ষে প্রচার করেন এবং প্রায় ৭০% জনগণ গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দেন। গণভোটে পাস হওয়ায় তা আইনে পরিণত হয় এবং একই সাথে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপি ও তার শরীকরা স্বাক্ষর না করে শুধু এমপি পদে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু বিএনপি প্রথমেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন। এবারে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই জুলাই যোদ্ধা এবং উভয়ই ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের ভুক্তভোগী। কিন্তু জুলাই সনদ না মেনে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এই তিন মাসের শাসনামলে সরকারের এটা একটা বড়ো ব্যর্থতা বলে মনে হয়।
বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পরিবর্তন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন এবং সকল সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় লোক নিয়োগ মোটেই ভালো করেননি। থানায় জিডি করতে গিয়ে ছাত্রদলের হাতে আক্রান্ত হওয়াটা বিগত ফ্যাসিবাদ সরকারের ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাসের কথাই স্মরণ করে দেয়। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অন্যতম চাওয়া ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার পরিবেশ থাকবে, সেখানে মাস্তানি থাকবে না ও ভিন্ন আদর্শের শিক্ষার্থীদের মাঝে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি থাকবে এবং ছাত্র রাজনীতি হবে শিক্ষার্থীবান্ধব। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের সাথে ছাত্রদলের আগ বাড়িয়ে ফ্যাসাদ সৃষ্টি কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তিত পরিবেশে কাম্য নয়।
এবারের সংসদের বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো জনসমর্থিত বিরোধী দল। তবে এই বিরোধী দল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা এবং সরকারকে হঠিয়ে নিজেদেরকে সরকারের আসনে আসীন হওয়ার কোনো আকাক্সক্ষা নেই। সকল ভালো কাজে সহযোগিতা এবং মন্দ কিছু দেখলে তা সরকারের গোচরে আনতে চায়। তবে এটা ঠিক যে জনস্বার্থের পরিপন্থী কিছু ঘটলে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে বিরোধী দল বাধ্য হবে সংসদে বিরোধিতার পাশাপাশি রাজপথে প্রচণ্ড গণআন্দোলন গড়ে তুলতে এবং এই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শরীক হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের পূর্বে এবং পরে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছেন। জনগণের ধারণা প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর মš¿িসভায় প্রতিবেশি দেশের কিছু দালাল ঘাপটি মেরে রয়েছে।
বর্তমান বিএনপি সরকার নির্বাচনে ৩১দফা কর্মসূচী ঘোষণা করে। সেই কর্মসূচীর সূচনায় সংবিধান সংস্কার, উচ্চকক্ষ, স্বাধীন বিচার বিভাগ, কেয়ারটেকার সরকারের বিধানসহ রাষ্ট্রকাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনের পূর্বে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি মোতাবেক খাল খনন কর্মসূচি ও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এটি একটা ভালো দিক। কারণ জনগণ চায় সরকার যেন তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করে। খালকাটা কর্মসূচি মূলত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৃষিনির্ভর বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর ও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি মহৎ কর্মসূচি ছিল। আমাদের কৃষির বড়ো সমস্যা হলো অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি। প্রয়োজনে খাল থেকে পানি সেচ এবং অতিবৃষ্টি হলে পানি নিস্কাশনের লক্ষ্যে এই খাল খনন। সাথে মৎস্য চাষ, পাড় দিয়ে চলাচলের রাস্তা ও বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি ছিল। আমাদের দেশপ্রেম বক্তৃতা-বিবৃতিতে। প্রায়ই দেখা যায় সরকার পরিবর্তন হলে পূর্বের সরকারের প্রকল্প পরিত্যক্ত হয়। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মাধ্যমে হতদরিদ্র মানুষকে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে মূলত একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। সাধারণ জনগণ চায় রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করুক, সরকার তার টার্ম পাঁচ বছর পূর্ণ করুক এবং জুলাই বিপ্লবের গণআকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হোক। বিরোধী দলের ভূমিকা খুবই ইতিবাচক। সম্প্রতি বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান জাপান সফরে গিয়ে সেখানকার সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দান করেছেন। এখন সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের আচরণ ও সদিচ্ছার ওপর।