গত তিন মাসে সরকারের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে যেমন কিছু আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ চোখে পড়ে, তেমনি কিছু সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। একটি দায়িত্বশীল সরকারের মূল দায়িত্ব শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজে ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ বজায় রাখা। এই বিবেচনায় সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মূল্যায়ন করলে ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু গুরুতর দুর্বলতাও চিহ্নিত হয়।

প্রথমেই সরকারের প্রশংসনীয় কিছু উদ্যোগের কথা বলতে হয়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি বৃদ্ধি, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি এবং প্রশাসনিক সেবার ডিজিটালাইজেশন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কিছুটা লাঘব করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কারে সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা দেশের অগ্রগতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সফল অভিযানও জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করেছে যে সরকার অপরাধ দমনে আন্তরিক।

তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি কিছু উদ্বেগজনক বাস্তবতাও সামনে এসেছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মব সৃষ্টির প্রবণতা জনগণের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে, সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করে কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা মব আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। এটি শুধু সরকারের ভাবমর্যাদাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সরকারের উচিত এ ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া। রাজনৈতিক পরিচয় যেই হোক না কেন, অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। চাঁদাবাজি ও মব সৃষ্টির মতো অপতৎপরতা কোনোভাবেই প্রশ্রয় পেতে পারে না। কারণ এসব অন্যায় রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল করে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে।

এমন বাস্তবতায় সরকারের দায়িত্ব শুধু সমালোচনা মোকাবিলা করা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিপক্ষ হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে তারা কখনোই একে অপরের শত্রু হতে পারে না। সরকার যদি আন্তরিকভাবে বিরোধী দলকে আলোচনার টেবিলে আমন্ত্রণ জানায় এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করে, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান হওয়া উচিত-আসুন, আমরা রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে দেশের দুর্বলতা দূরীকরণে একসঙ্গে কাজ করি। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান গ্রহণ করি। কারণ জনগণ সংঘাত চায় না, তারা চায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন।

সবশেষে বলা যায়, গত তিন মাসে সরকারের কিছু পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার হলেও চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মতো সমস্যা দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করা জরুরি। সরকার যদি আন্তরিকতার সঙ্গে বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ গড়ে তোলে, তবে দেশের চলমান দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এখন সময় বিভাজনের রাজনীতি নয়, ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার।