চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার আবু জাফর রোড বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আটক করে পুলিশ থানায় নিতে গেলে ক্ষুব্ধ জনতা তাকে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। এ নিয়ে টানা প্রায় সাত ঘণ্টা পুলিশ ও জনতার মধ্যে উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলীর ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : স্থানীয় সূত্র জানায়, চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার একটি ভবনে পরিবারের সঙ্গে নানীর বাসায় থাকত সাড়ে তিন বছরের শিশুটি। শিশুটির বাবা গাড়িচালক এবং মা পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। দুপুরের দিকে শিশুটি বাসার বাইরে খেলতে বের হয়। পরে অনেকক্ষণ তাকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

বিকেলের দিকে পাশের একটি ভবনের সিঁড়িঘরে কান্নারত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। পরে তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় একটি ডেকোরেশন দোকানের কর্মচারী মনির হোসেন শিশুটিকে চকলেট ও নানা প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে।

স্থানীয়দের হাতে আটক অভিযুক্ত : ঘটনার খবর মুহূর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে তাকে একটি মাদ্রাসা ও ভবনের ভেতরে আটকে রাখা হয়। খবর পেয়ে বাকলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

কিন্তু পুলিশ তাকে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করলে উত্তেজিত জনতা বাধা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, “ধর্ষককে পুলিশের হাতে দিলে পরে জামিনে বের হয়ে যাবে।” তারা প্রকাশ্যে শাস্তির দাবি জানায়।

একপর্যায়ে শত শত মানুষ বিসমিল্লাহ ম্যানশন ও আশপাশের সড়ক ঘিরে ফেলে। অভিযুক্তকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়।

৭ ঘণ্টা অবরুদ্ধ পুলিশ : বিকেল প্রায় ৩টা থেকে রাত সোয়া ১০টা পর্যন্ত পুলিশ কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়ে। অভিযুক্তকে নিয়ে বের হতে গেলে বারবার বাধার মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বিক্ষুব্ধ জনতা স্লোগান দিতে থাকে-“ধর্ষকের ফাঁসি চাই” “ধর্ষককে আমাদের হাতে দাও”

“আইনের বিচার নয়, জনতার বিচার চাই”

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও উত্তেজনা ক্রমেই বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়।

টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলী : রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ কয়েক দফায় বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে-টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে, সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে, ফাঁকা গুলী চালায়। তবে এতেও জনতা পিছু হটেনি। উল্টো পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুরো এলাকায় ধোঁয়া, চিৎকার আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

সাংবাদিকসহ আহত অন্তত ৩০ : সংঘর্ষ চলাকালে ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন-দৈনিক আজাদীর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার নেজাম উদ্দিন আবীর, ক্যামেরাম্যান মোহাম্মদ আরশাদ, চট্টগ্রাম প্রতিদিনের মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসান। এছাড়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন দৈনিক আজকের পত্রিকার মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আব্দুল কাইয়ুম। এক ঘন্টা পর পুলিশ ও সাংবাদিকেরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।

জানা যায়, ফেসবুক লাইভ করার সময় গুলী ও সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে তারা আহত হন। পরে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়া সংঘর্ষে আরও অন্তত ৩০ জন আহত হন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশের গাড়িতে আগুন : রাত ১০টার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এসময় অভিযুক্তকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে উত্তেজিত জনতা পুলিশের একটি গাড়ি ঘিরে ফেলে।

একপর্যায়ে কয়েকজন যুবক গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে গাড়ির সামনের অংশ পুড়ে যায়। পরে পুলিশ পিছু হটে নতুন অবস্থান নেয়।

এসময় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বাকলিয়া অংশেও অবরোধ সৃষ্টি করা হয়। টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ চালায় উত্তেজিত জনতা।

বিদ্যুৎ চলে গেলে কৌশলে সরানো হয় অভিযুক্তকে : রাত সোয়া ১০টার দিকে এলাকায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। সেই সুযোগে পুলিশ কৌশলে অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয়। প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা চেষ্টার পর অবশেষে তাকে বাকলিয়া থানায় নেওয়া সম্ভব হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

অভিযুক্তের বক্তব্য : ঘটনার সময় পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় সাংবাদিকদের সামনে অভিযুক্ত মনির হোসেন বলেন,

“আমাকে শয়তানে পাইছে। আমার ভুল হইছে।” স্থানীয়দের দাবি, তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশু : ঘটনার পর শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

শিশুটির চাচা মাসুম জানান, “আমার ভাতিজি দুপুরে বাসার বাইরে খেলতে যায়। পরে তাকে সিঁড়িঘরে কান্নারত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার শারীরিক অবস্থা দেখে আমরা হাসপাতালে নিয়ে আসি।”

চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপ-পরিদর্শক সোহেল রানা জানান, শিশুটির চিকিৎসা চলছে এবং চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।

পুলিশের বক্তব্য : বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোলাইমান বলেন, “ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। তবে কিছু মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “শিশুটিকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।” তাকে গতকাল শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

নগর পুলিশের কর্মকর্তারাও জানান, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলী ছুড়তে বাধ্য হয়েছে।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও আতঙ্ক : ঘটনার পর পুরো দক্ষিণ বাকলিয়া এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। রাতভর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ধর্ষণের মতো ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এ কারণেই জনতা অভিযুক্তকে নিজেদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়।

তবে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ভয়াবহ অপরাধের বিচার অবশ্যই দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

‘পতিত ফ্যাসিস্টদের সুযোগ নেওয়ার’ অভিযোগ : ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেন, প্রথমদিকে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে অংশ নিলেও পরে একটি উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। তারা গাড়ি ভাঙচুর, আগুন দেওয়া এবং বিশৃঙ্খলা তৈরিতে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত সড়কে নেমে যানবাহনে হামলা, চাঁদাবাজি ও সাধারণ মানুষকে মারধরের মতো কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ে। তাদের দাবি, “পতিত ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর লোকজন পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে।” তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।