খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আটকে গেছে শতাধিক রোগীর অপারেশন। ফলে দুই মাসের অধিক সময় অপেক্ষা করা রোগীদের অপারেশন না হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তার পড়েছে তারা। জেনারেল অপারেশন থিয়েটারে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অপারেশন হলেও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড না থাকায় রোগীর জ্ঞান ফেরা নিয়ে ঝুঁকি কমছে না। অগ্নিকাণ্ডে অক্সিজেন লাইন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়া, বন্ধ রয়েছে জরুরি অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড এবং চোখের অপারেশন। এদিকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাউকে দায়ী না করে দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে আগুনের ঘটনায় সোনাডাঙ্গা থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। গত বুধবার সকালে ঘাড়ে অপারেশন হওয়ার কথা ছিল, জালাল হোসেন নামে এক ব্যক্তির। দুই মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করে আশায় ছিল অপারেশন করে বাড়িতে গিয়ে ঈদের উৎসব পালন করবে। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল অপারেশন হয়নি। কবে সিরিয়াল পাওয়া যাবে, তাও অনিশ্চিত।
সরেজমিন দেখা যায়, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে অপারেশনের অপেক্ষায় ৩৫ রোগী ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন ভর্তি রয়েছে প্রায় তিন মাস ধরে, যাদের বুধবার অপারেশন হওয়ার কথা ছিল।
সহকারী অধ্যাপক ডা. রিয়াজ আহমেদ হাওলাদার বলেন, আমরা বৃহস্পতিবার অপারেশন করতে পারিনি। অন্তত ১০জন রোগী অপেক্ষায় ছিল। বাকিদের পরের সপ্তাহে করা হতো কিন্তু এখন সিরিয়াল পাওয়া সাপেক্ষে করতে হবে। এরপর ঈদের ছুটির কারণে একটা ভোগান্তি তৈরি হলো রোগীদের।
একই অবস্থা সার্জারি বিভাগের হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ৯-১০ এবং ১১-১২ ওয়ার্ডের জেনারেল ও ইমার্জেন্সি মিলে গত ২ দিনে ৫০টি অপারেশন মিস হয়েছে। জেনারেল ওটিতে মাত্র ২টি অপারেশন করতে পেরেছে। পোস্ট অপারেটিভ বেড না থাকায় মাত্র ২টি অপারেশন করা হয়েছে।
সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. কনক হোসেন বলেন, আমরা অপারেশন করতে পারছি না। প্রতিদিন সার্জারির দুই ওয়ার্ডে ছোট বড় মিলে প্রায় ৪০টি অপারেশন করা হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার মাত্র ২টি করতে পেরেছি। জরুরি কিছু রোগী সদর হাসাপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এছাড়া ইউরোলজি, গাইনি, শিশু সার্জারি, নাক, কান, গলা ও চোখ মিলে শতাধিক রোগীর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল বুধ ও বৃহস্পতিবার। কিন্তু সব মিলে ৬টি রোগীর অপারেশন করা সম্ভব হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে অক্সিজেন লাইন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে।
এদিকে দুপুরের মধ্যেই অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করে জেলা প্রশাসক-এর কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, তদন্ত কমিটি এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে নিছক দুর্ঘটনা হিসাবে উল্লেখ করেছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল ভবনটি অনেক পুরোনো, প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো। তাই শর্টসার্কিট থেকে এই ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছি। মন্ত্রীর চাহিদা অনুযায়ী তদন্ত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, কমিটি ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের চেয়ে সুপারিশেই শেষ করেছে তদন্ত প্রতিবেদন।
এদিকে সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, খুলনা মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি) করা হয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭ টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চারতলার শিশু ওয়ার্ডে একটি মাল্টিপ্লাগে শর্ট সার্কিট থেকে ধোঁয়া বের হলে মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে অসুস্থ রোগীরা হাসপাতালের সামনে রাস্তায় অবস্থান নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হাসপাতালের ৪ তলার শিশু ওয়ার্ডে একটি বেডের পাশে রাখা মাল্টিপ্লাগে শর্টসার্কিট হলে সামান্য ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এতে চারিদিকে আগুন আগুন বলে চিৎকার শুরু করে সাধারণ রোগী ও স্বজনরা। শিশু ওয়ার্ডে অক্সিজেনরত রোগীদেরও দ্রুত নিচে নামিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি অপারেশনের রোগীদেরও স্বজনরা নিচে নিয়ে আসেন। এতে রোগীদের মধ্যে চরম আতংক তৈরী হয়।
রোগীর স্বজনরা জানায়, আগুনের খবর শুনেই আগের দিনের ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত রোগীদের নিয়ে নিচে নেমে আসি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে। তবে কোথাও আগুনের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, একটি গুজবের কারণে কিছুক্ষণের জন্য আগুন আতংক ছড়িয়ে পড়ে। আসলে আগুনের কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে তাড়াহুড়োর কারণে এভাবে আতংকে ছড়িয়ে পড়লে অসুস্থ হয়ে মানুষ এমনিতেই আরও বেশি অসুস্থ হতে পারে। তিনি গুজবে কান না দেয়ার পরামর্শ দেন সবাইকে।
উল্লেখ্য, ২০ মে (বুধবার) ভোর ৬টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে ইর্মাজেন্সী অপারেশন থিয়েটার ভস্মীভূত হয়। এ সময় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে হাসপাতালের দুজন নার্স নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া আইসিইউ থেকে সরানোর সময় নাসরিন নাহার নামের এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আহতরা হলেন, হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, দিপালী ও শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্য তৌহিদ।