মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে : নদীপথ অতিক্রম করে প্রতিদিন ভোর, দুপুর কিংবা গভীর রাতে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন মংলা অঞ্চলের বহু নারী। অতীতের অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্য পেছনে ফেলে তারা এখন একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। জীবিকার প্রয়োজনে সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলা এসব নারীর জীবনে এসেছে লক্ষণীয় পরিবর্তন।
একসময় সুন্দরবন ঘেরা নদ-নদীতে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে মাছ ধরা ছিল তাদের প্রধান আয়ের উৎস। দিন এনে দিন খাওয়ার মতো অবস্থার মধ্যেই চলত তাদের জীবন। দীর্ঘদিনের এই অনিশ্চিত জীবনধারা এখন বদলে গেছে। বর্তমানে তারা শিল্পাঞ্চলে কাজের সুযোগ পেয়ে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে সমানতালে শ্রম দিচ্ছেন। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করে তারা মাসিক নির্দিষ্ট আয় করছেন, যা তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
এক নারী কর্মী জানান, আগে অল্প আয় দিয়ে সংসার পরিচালনা করা কঠিন ছিল। তবে ইপিজেডে কাজ শুরু করার পর ধীরে ধীরে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আরেকজন বলেন, স্বামীর একার আয়ে পরিবার চালানো সম্ভব না হওয়ায় তিনি কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ করেন। বর্তমানে তাদের পরিবার অনেকটাই স্বাবলম্বী।
একজন স্বামী জানান, আগে সংসারের সমস্ত ব্যয়ভার তাকে একাই বহন করতে হতো। কিন্তু এখন স্ত্রী কাজ করার ফলে তাদের আয় বেড়েছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। অন্য এক নারী কর্মী বলেন, পরিবারের দুইজনের আয়ে এখন সংসার স্বাচ্ছন্দ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সুফল পাচ্ছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও। এক শিক্ষার্থী জানায়, তার মায়ের চাকরির কারণে এখন তার পড়াশোনার সব খরচ নির্বিঘ্নে মেটানো সম্ভব হচ্ছে এবং আর কোনো অভাব নেই।
মংলার শিল্পাঞ্চলের একমাত্র রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) এসব নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে এখানে ২৯টির বেশি কারখানা চালু রয়েছে, যার মধ্যে আটটি একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান জানান, নারীদের কর্মসংস্থানে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছেন।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় জনপদগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে নারীদের সমস্যা ও প্রয়োজনগুলো চিহ্নিত করা হয়। এরপর তাদের উপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এই লক্ষ্যেই একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নারীরা প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি সনদ অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা আগে পরিবারে পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বর্তমানে তারা নিজেরাই পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলছেন। এতে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটছে এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তারা আরও বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে নারীদের জন্য আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নারীদের আরও সক্ষম করে তোলা গেলে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
মংলা ইপিজেডে কর্মসংস্থানের ফলে এসব নারী তাদের পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়ে দেশের রাজস্ব আয়ে অবদান রাখছে।