চারপাশের পরিবেশ-প্রকৃতি সুন্দর হলে আমরা আনন্দ পাই। আর মানুষগুলো মহৎ হলে আনন্দের সীমা থাকে না। পরিবেশ আর মানুষ মিলেই তো আমাদের সমাজ। সমাজ ছোট পরিসরে হতে পারে, আবার হতে পারে অনেক বড়; যেমন বিশ^সমাজ। তবে সমাজের এই আলোচনায় ‘প্রতিবেশী’ শব্দটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা পাড়ার প্রতিবেশী হোক কিংবা দেশের প্রতিবেশী। প্রতিবেশী ভালো হলে সুখের মাত্রা বাড়ে, আর মন্দ হলে বাড়ে দুঃখের মাত্রা। তাই সুপ্রতিবেশী মানুষের কাম্য বিষয়। তবে কাম্য হলেও সুপ্রতিবেশী সবার ভাগ্যে জোটে না। ফলে জীবনযাপনে প্রয়োজন হয় হিসেব-নিকেশ, সচেতনতা ও যথাআচরণ।
ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। বড় দেশ হওয়ার কারণে প্রতিবেশী দেশের সাথে যথাআচরণ কিংবা সদাচরণের দায়িত্বটা ভারতের বেশি। কারণ উদাহরণটা সৃষ্টি করতে হয় বড়দেরই। উদাহরণ দেখলে বাংলাদেশও সহজেই নির্ধারণ করতে পারবে নিজের কর্তব্য। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের প্রতি বাড়িয়ে দিয়েছে বন্ধুত্বের হাত, স্থাপন করেছে সুপ্রতিবেশীর উত্তম উদাহরণ। কিন্তু বিনিময়ে সঙ্গত ভূমিকা পালনে সমর্থ হয়নি ভারত। এ ক্ষেত্রে মন্দ উদাহরণ হলো নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমল। পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা তো প্রকাশ্যে উচ্চকণ্ঠেই বলেছেন, ভারতকে এতোটাই দিয়েছিÑযা কখনো তারা ভুলতে পারবে না। একটি সরকার কতটা তাঁবেদার হলে এমন কথা বলতে পারে? হাসিনা হয়তো ভেবেছিলেন, পাশে ভারতের মত বড় রাষ্ট্র থাকলে তার তাঁবেদার সরকারকে হটাবে কে? হাসিনার এমন উচ্চারণে মোদি সরকারের লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা লজ্জা পান নি। বরং আগ্রাসনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে গেছেন। এমন আচরণের মাধ্যমে ভারত সরকার শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বের অবমাননাই করেনি, অপমানিত করেছে ভারতের সংবিধান এবং ভারতীয় জনতার মৈত্রীর চেতনাকেও। এমন নীতিহীনতা, স্বার্থান্ধতা ও ক্ষুদ্রতা দিয়ে দেশকে বড় করা যায় না, প্রতিবেশী দেশের সাথেও গড়া যায় না বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এর বড় প্রমাণ তাঁবেদার হাসিনা সরকারের পতন। শুধু কি হাসিনা সরকারের পতন, পতন হয়েছে ভারতের আগ্রাসী পররাষ্ট্র নীতিরও।
তাঁবেদার হাসিনা জনরোষের মুখে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে। দ-প্রাপ্ত এই নেত্রী মোদি সরকারের প্রশ্রয়ে ভারতে রাজনীতি করছেন, সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। ভারতের এমন আচরণে উপলব্ধি করা যায়, বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকে সম্মান করতে মোদি সরকার অসমর্থ। ফলে প্রশ্ন জাগে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসল যে নির্বাচন সেই নির্বাচনে বিজয়ী সরকারকে ভারতের স্বীকৃতি ও অভিনন্দন জানানোর তাৎপর্যই বা কী? এখানে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, আসলে কোনো ব্যক্তি নয়; ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পথে মূল বাধা হলো স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি। সমমর্যাদার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব। কথামালা কিংবা কূটনৈতিক চাতুর্য এর বিকল্প হতে পারে না। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কখনো একপক্ষীয় বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে রেখেছে, কিন্তু ভারত তাতে সঙ্গত সাড়া দেয়নি। তবে ভারত একেবারেই যে হাত বাড়ায়নি তা কিন্তু নয়। তবে সে হাত ছিল আগ্রাসনের, বঞ্চনার এবং চাতুর্যের। এসব দিয়ে কি বন্ধুত্ব হয় কিংবা হওয়া যায় সুপ্রতিবেশী?
মোদি সরকারের কথা কম বলাই ভালো। কারণ, এ সরকারের নেতিবাচক কর্মকা-ের ফিরিস্তি এই ছোট্ট পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে প্রতিবেশি দেশের নাগরিক হিসেবে আজ মাত্র দু’টি বিষয় তুলে ধরতে চাই। এই দু’টি বিষয় ভারতের মত একটি বড় দেশের ইমেজ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর একটি হলো সংখ্যালঘু দমন-পীড়ন, অপরটি হলো প্রতিবেশী দেশে মাদক ও অস্ত্রের চালান। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর দমন-পীড়ন ও জুলুুমের কাহিনী বিশ^বাসী জানে। মসজিদ-মাদরাসার মত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও হামলা হচ্ছে সেখানে। মুসলমান ছাড়াও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর দমন-পীড়নের মাত্রা বেড়েছে ভারতে। দমন-পীড়নের এমন নীতির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থা।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী উগ্র সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসি আইআরএফ) নামের সংস্থাটি। USCIRF হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের একটি স্বাধীন ও দ্বি-দলীয় সংস্থা। ১৯৯৮ সালের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে সংস্থাটি গঠিত হয়। বিশ^জুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেসকে নীতিগত সুপারিশ প্রদান করা এর প্রধান কাজ। তবে এই সুপারিশগুলো মানা মার্কিন সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। সংস্থাটি ভারতের সংখ্যালঘু বিষয়ক ঘটনাবলিতে উদ্বেগ জানিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারিতে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তারা মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ভারতীয় কর্মকর্তাদেরকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাপ দেয়। এতে বলা হয়, গত কয়েক মাসে হিন্দু জাতীয়তাবাদি জনতা কর্তৃক খৃস্টানদের লক্ষ্য করে সহিংস হামলা বেড়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ভিকি হার্টজলার বলেন, ‘জানুয়ারি মাসে খৃস্টানদের ওপর একের পর এক ভয়াবহ হামলা হয়েছে। আমরা বিশেষ করে উড়িশ্যায় একটি বাড়ির ভেতরে রোববারের প্রার্থনা পরিচালনা করার সময় যাজক বিপিন বিহারী নায়েককে হিন্দু জনতার মারধরের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। জনতা তার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের অভিযোগ তোলে, তাকে বাইরে টেনে নিয়ে যায় এবং গোবর খেতে বাধ্য করে।’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জানুয়ারিতে যাজক নায়েকের ওপর হামলা ছাড়াও মহারাষ্ট্রে চারটি খৃষ্টান পরিবারের বাড়িঘর ভেঙ্গে দেয় হিন্দু জাতীয়তাবাদি জনতা।
একই মাসে অন্ধ্র প্রদেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ইভাজেলক্যাল খৃস্টানদের একটি মিনিবাসে হামলা চালায়, গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। যাত্রীদের ক্রিকেট ব্যাট ও পাথর দিয়ে মারধর করে। ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিশগড়ে হিন্দু মন্দির অপবিত্র করার অভিযোগ তুলে মুসলমানদের ছয়টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় হিন্দু জনতা। এসব ভারতের সংখ্যালঘু দমন-পীড়নের কিঞ্চিৎ চিত্র মাত্র। এর আগে ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে USCIRF ভারতের পদ্ধতিগত, চলমান এবং চরম ধর্মীয় স্বাধীনতা লংঘনের জন্য দেশটিকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে সুপারিশ করে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, সংস্থাটি আরএসএস নেতাদের কূটনৈতিক সৌজন্য না দেখানোরও আহ্বান জানিয়েছে।
তারা আরএসএসকে একটি ‘ছাতা সদৃশ সংগঠন’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, এর অধীনস্থ বিভিন্ন সংগঠন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, মার্কিন সরকারের উচিত ধর্মীয় বিশ^াসের স্বাধীনতা লংঘনের জন্য দায়ী আরএসএস সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দিকে মনোযোগ দেওয়া। এমন প্রতিবেদন ও আহ্বান মোদি সরকারের মধ্যে কোনো বোধোদয় ঘটাতে সক্ষম হয় কিনা, তা একটি দেখার মত বিষয় বটে।
ভারতে সংখ্যালঘু দমন-পীড়নের বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। এছাড়া ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদক ও অস্ত্র ঢোকার বিষয়টিও খুবই দুঃখজনক। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের প্রভাব কেমন হয়, তা ভারতের না জানার কথা নয়। তারপরও ভারত থেকে মাদক, অবৈধ অস্ত্রের চালান বাংলাদেশে ঢোকার কর্মকা- অব্যাহত রয়েছে। ভারত সরকার চাইলে বিষয়টি বন্ধ হতে পারে। কিন্তু তেমন শুভ আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যাও বন্ধ হচ্ছে না। পুশ ইনের আগ্রাসনও চলছে। এসব তো বন্ধু রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ ভারতের জনগণের সাথে মৈত্রীর বন্ধন চায়। এ জন্য তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে ভারত সরকারকে। সম্মান ও সমতার চেতনাই পারে প্রতিবেশী দেশ দু’টির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কাক্সিক্ষত পথে এগিয়ে নিতে।