দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো সড়কে প্রাণ যাচ্ছে, পঙ্গুত্ব বরণ করছে মানুষ, স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার। বছরের পর বছর ধরে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর কথা বলা হলেও বাস্তবতা খুব একটা বদলায় নি। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি, দুর্বল তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সড়ক যেন ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো নতুন করে আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই। দেশের সড়কের দিকে তাকালেই এর বড় একটি অংশ স্পষ্ট হয়ে যায়। মেয়াদোত্তীর্ণ ও যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি নির্বিঘেœ চলছে। অনেক চালকের নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা। কোথাও অতিরিক্ত গতি, কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, আবার কোথাও চালকের অসতর্কতা মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিচ্ছে মানুষের জীবন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এসব ঝুঁকির অনেকগুলোই আগে থেকে জানা এবং প্রতিরোধযোগ্য।
ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ। দেশের সড়কে এমন অসংখ্য বাস, ট্রাক, লরি ও অন্যান্য যান চলাচল করে যেগুলোর যান্ত্রিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। দুর্বল ব্রেক, নষ্ট লাইট, ত্রুটিপূর্ণ স্টিয়ারিং, জীর্ণ টায়ারসহ নানা ধরনের সমস্যা নিয়েই অনেক গাড়ি রাস্তায় নামে। একটি ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি যখন মহাসড়কে উচ্চগতিতে চলে, তখন সেটি শুধু চালক ও যাত্রী নয়, আশপাশের পথচারী এবং অন্য যানবাহনের জন্যও ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব গাড়ি ফিটনেস সনদ পায় কীভাবে? একটি গাড়ি বাস্তবে চলাচলের উপযোগী না হলেও যদি কাগজে সেটি ‘ফিট’ হয়ে যায়, তাহলে এর দায় কার? ফিটনেস পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। দালালচক্র, ঘুষ, দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের সুযোগ থাকলে কাগজের ফিটনেস সনদ কখনোই সড়কের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
চালকের দক্ষতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ি চালানো শুধু স্টিয়ারিং ও গিয়ার নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। ট্রাফিক আইন জানা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, গতিসীমা মেনে চলা, পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের প্রতি সতর্ক থাকা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। অথচ আমাদের দেশে পেশাদার চালক তৈরির প্রক্রিয়া এখনও যথেষ্ট মানসম্মত ও কার্যকর নয়। ফলে অদক্ষ ও অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকের হাতে ভারী যানবাহন তুলে দেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন খাতের নানা অনিয়ম। অনেক ক্ষেত্রে চালকদের ওপর অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়ার চাপ থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা, দীর্ঘ সময় বিরতিহীন গাড়ি চালানো এবং অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহনের প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। একজন ক্লান্ত বা চাপের মধ্যে থাকা চালক সামান্য ভুল করলেই তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
তবে শুধু চালক বা মালিককে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর পেছনে রয়েছে একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। একটি অদক্ষ চালক কীভাবে লাইসেন্স পান? একটি ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি কীভাবে ফিটনেস সনদ পায়? নিয়মিত রাস্তায় চলাচলকারী ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অমীমাংসিতই থেকে যাবে। আইন রয়েছে, প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তদারকির ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং বিভিন্ন স্তরের দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে কাগজে-কলমে সড়ক নিরাপত্তার অনেক ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তাই শুধু নতুন আইন নয়, বিদ্যমান আইন ও বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং তদারকি ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করা।
দুর্ঘটনা ঘটার পর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থাও অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। মহাসড়কের পাশে পর্যাপ্ত জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দ্রুতগামী অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা অনেক জীবন রক্ষা করতে পারে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা যতই উন্নত করা হোক, দুর্ঘটনার কারণগুলো দূর করা না গেলে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না। সড়ক নিরাপত্তাকে তাই কেবল পরিবহন মন্ত্রণালয় বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে যুক্ত সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। গাড়ির ফিটনেস, চালকের দক্ষতা, সড়কের অবস্থা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, সবগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সড়ক দুর্ঘটনাকে ভাগ্যের লিখন হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত তদারকি ব্যবস্থা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এগুলো মানুষের তৈরি সমস্যা এবং যথাযথ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা থাকলে এগুলোর সমাধান সম্ভব।