পঞ্চম কিস্তি

আমরা যখন জুলাই মাসে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রদেশসমূহ সফর করছিলাম তখন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে অত্যন্ত ফলাও করে দুটি খবর প্রকাশিত হচ্ছিল। প্রথম খবরে বলা হচ্ছিল যে পাকিস্তানের বৃহত্তর প্রদেশ বালুচিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং তাদের মুক্তিবাহিনী রাজধানী কোয়েটা দখল করে নিয়েছে। বলাবাহুল্য, এ প্রদেশের আয়তন পাকিস্তানের মোট আয়তনের ৪৪ শতাংশ। প্রদেশটির উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তান, পূর্বে পঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ, উত্তর-পূর্বে খায়বার পাখতুনখোয়া, পশ্চিমে ইরান এবং দক্ষিণে আরব সাগর। অর্থাৎ ভূগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত দিক থেকে প্রদেশটির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে আয়তনের দিক থেকে দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ হলেও বালুচিরা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশের কাছাকাছি; প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪২.৮৯ জন। এতবড় একটি ঘটনা, অথচ সফরকালে আমরা এর কোনো উপসর্গ দেখিনি। একইভাবে তখন গণমাধ্যমে আরেকটি খবরও প্রচারিত হতে দেখা যায়। খবরে বলা হয় পাকিস্তান আফগানিস্তানের সাথে স্থল ও আকাশ পথে প্রচণ্ড যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং এর ফলে হাজার হাজার আফগান হতাহত হচ্ছে। আফগানিস্তান সেন্ট্রাল ও সাউথ এশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত একটি মুসলিম দেশ। দেশটির সরকারি নাম হচ্ছে আফগান ইসলামী আমিরাত। আয়তন ৬,৫২,৮৫৭ বর্গকিলোমিটার এবং জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এর লোকসংখ্যা ৪,৫০,৪৭,০৬৯ জন; প্রতি কিলোমিটারে ৬৯ জন। দেশটির মোট জনসংখ্যা শতকরা ৯৯ জন মুসলিম, যার ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ সুন্নি। আফগানিস্তানের সেনা সংখ্যা ১,৭২,০০০, দেশটিতে তালেবানদের শাসন চলছে। আফগানিস্তানের সেনা কাঠামোয় বিমান ও নৌবাহিনী নেই।

আফগানরা স্বাধীনচেতা, দশকের পর দশক ধরে তারা রুশ ও মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশটির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করে আসছে। অনেকের মনে প্রশ্ন : চৌধুরী রহমত আলীর ফরমুলা (তথা পাকিস্তান শব্দ গঠনের Coinage পাঞ্জাবের P আফগানিস্তানের A ইত্যাদি) অনুযায়ী আফগানিস্তান কেন ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে যোগ দিল না? এর উত্তর হচ্ছে, সাত চল্লিশের দেশ বিভাগ ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বৃটিশ বারতের বিভাগ। আফগানিস্তান কখনো বৃটিশের অধীনে ছিল না। আফগান ছিল একটি স্বাধীন-সার্বভৌম স্বতন্ত্র রাজতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র। ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত আফগানিস্তান ও বৃটিশ ভারতের মধ্যে নির্ণিত সীমান্ত রেখা ১৮৯৩ সালে আঁকা হয়েছিল। আফগানিস্তানের যুক্তি ছিল ১৯৪৭ সালে বৃটিশরা চলে যাবার পর উপনিবেশিক আমলে সম্পাদিত কোনো চুক্তিই কার্যকর থাকে নি। তারাই পাশতুন ভূখণ্ডের মালিক এবং এ প্রেক্ষিতে আফগানরা নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে স্থায়ীভাবে আন্তর্জাতিক সীমানা মেনে নিতে অস্বীকার করে।

অন্যদিকে তারা দাবি করে যে, বৃটিশ ভারতের পাশতুন ও বালুচিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত ভূখণ্ডকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয় হোক যাতে করে তারা পাশতুনিস্তান নামে(পাকিস্তান নয়) একটি স্বতন্ত্র আবাস ভূমি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পাকিস্তানের মস্কোপন্থী ন্যাপের প্রধান ওয়ালি খানের পিতা ও সীমান্ত গান্ধি নামে পরিরচিত খান আবদুল গাফফার খান ভারতীয় কংগ্রেসের পক্ষ হয়ে ঐ সময়ে পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছিলেন এবং আফগানিস্তানের বাদশাহর পক্ষ হয়ে তার গঠিত খোদায়ী খেদমতগার পার্টির স্বেচ্ছাসেবকদের পাশতুনিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেছিলেন। তিনি অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই তিনি ১৯৪৮ সালে এর বিরোধিতায় পাকিস্তান আজাদ পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ভারতের জাতির পিতা, মোহনলাল করম চাঁদ গান্ধীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতীয় পার্লামেন্টের একটি যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন। ১৯৮৭ সালে তার মৃত্যুর এক বছর আগে, ভারত সরকার তাকে ঐ দেশের সর্বোচ্চ বেসরকারি খেতাব ‘ভারত রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার খান আবদুল গাফফার খান ও তার পুত্র ওয়ালি খান Friends of Liberation wart of

Bangladesh খেতাবে ভূষিত করেন। (মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা)। বলাবাহুল্য, ১৯৭১ সালে ভারত বিরোধি ভূমিকা ও অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে কথিত অবস্থানের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসি দেয়ার কয়েক মাস আগে চার শতাধিক বিদেশি নাগরিককে হাসিনা সরকার এ সম্মাননা প্রদান করেন। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অনেকেই এ বাস্তব ঘটনাগুলো আমরা ভুলে গেছি। বর্তমান প্রজন্ম তো জানেই না। আবার মুসলমানদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই যে তাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের উত্থান-পতনের ইতহিাস লিখেন বিধর্মীরা যারা এমনকি তাদের জাতিসত্ত্বার নাম নিতেও নারাজ। যেমন সাইমন ও কলির লেখা হিস্ট্রি অব সেরাসীন।

আমি পাক আফগান সীমান্তে অস্থিরতার কথা বলছিলাম। এ অস্থিরতা ও সংঘর্ষের একটি আশু কারণ সম্পর্কে যা জানা গেছে তা হচ্ছে Crossborder military বা আফগানিস্তানে তালেবান সরকার কর্তৃক তাহরিকে তালিবান পাকিস্তান (TTP) নামক একটি জঙ্গি সংস্থাকে সে দেশের ভূমি ব্যবহার করে পাকিস্তান ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে হামলা পরিচালনার অনুমতি প্রদান। তালেবানরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পাকিস্তান তা মানে নি। তারা টিটিপির সন্দেহজনক আস্তানাকে টার্গেট করে স্থল ও বিমান হামলা চালিয়েছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান উভয়েই মুসলিম দেশ। এ প্রেক্ষিতে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ নয় বরং আলোচনার টেবিলে বসেই বিষয়টি তাদের সুরাহা করা উচিত। আমাদের ভুললে চলবে না যে, দুনিয়ায় বিধর্মী নাস্তিক ও ইসলামের শত্রুরা মুসলিম মিল্লাতের যত ক্ষতি না করেছে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে আমাদের আলেম-উলেমা এবং মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্য।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সম্প্রতি মুসলিম উম্মার উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রচার করেছেন। তার ভাষণে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মুসলিম ও হিন্দুদের ধর্ম বিশ্বাস, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি প্রভতি ক্ষেত্রে বিরাজিত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে আমাদের পূর্ব পুরুষদের ত্যাগের কথা স্মরণ করেন এবং এ ইতিহাস বংশপরম্পরায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। পাকিস্তান-সৌদি আরব ও তুরস্ক মিলে ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাকিস্তান পার্লামেন্ট ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনিরকে দেশটির সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব প্রদান করে আইন প্রণয়ন করে। বাংলাদেশ সরকার ও জনসাধারণ ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে তার অংশীদার হবার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় পাকিস্তানী সেনাপ্রধানের উপরোক্ত বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। অবশ্য এতে ভারতীয় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অপপ্রচারের মাত্রা ও পরিসর অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফিল্ড মার্শাল মুনির একজন সাধারণ ধার্মিক পরিবারের সন্তান। তিনি নিজেও একজন কুরআনে হাফেজ। বেলুচিস্তান ও আফগানিস্তানে ভারতীয় ইন্ধন ও অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট নাশকতার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি একে পাকিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধের একটি ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন এবং গুজবে কান না দিয়ে প্রকৃত সত্যকে অনুসরণের আহ্বান জানান। এ ব্যাপারে তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা হুজরাতের ৬ নং আয়াতের উদ্ধৃতি দেন যাতে বলা হয়েছে : ‘ইয়া আইয়ুহাল লাজিনা আমানু ইনজায়াকুম ফাসেকুন বি নাবায়িন ফাতাবাইয়ানু আনতুসিবেহু আলা মা ফাআনতুম নাদেমীন।’ অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের নিকট কোনো খবর নিয়ে আসে তবে উহার সত্যতা যাচাই করে নাও। এমন যেন না হয় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো জনগোষ্ঠীর ক্ষতি সাধন করিয়া বসিবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনিরের বক্তব্যটি বিশেষ করে কুরআন-সুন্নাহর প্রতি তার অকুণ্ঠ আস্থা ও বিশ্বাস মুগ্ধ হবার মতো। ইসলামাবাদ ক্লাব কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। অত্যন্ত সাধাসিধে মুসল্লি ধরনের মানুষ। সেনাপ্রধানের পরিবার সদস্য হিসেবে তার মধ্যে কোনো গরিমা দেখা যায়নি। শুনলাম সেনাপ্রধান ইতোমধ্যে ক্যান্টনমেন্টসমূহে মদের বার নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। কথাগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে বলব তিনি অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি কাজ করেছেন।

পাকিস্তানী জেনারেলদের দুটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে দুনিয়াব্যাপী একটি খ্যাতি আছে এবং তাদের পেশাগত দক্ষতা এবং দুই, দেশপ্রেম ও ডেভেলপমেন্ট অরিয়েন্টেশন। তাদের আরেকটা বদনামও আছে। সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস। আমরা দোয়া করি ফিল্ড মার্শাল মুনিরকে যেন আল্লাহ তায়ালা সকল প্রকার লোভমুক্ত থেকে মুসলিম মিল্লাতের খাদেম হিসেবে কবুল করেন এবং আধুনিক বিশ্বের আরেকজন খালিদ বিন ওয়ালিদ বানিয়ে দেন।

পাকিস্তান বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। এখানে নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, সমভূমি, মরুভূমি, বনভূমি, তেল-গ্যাস ও লবণের খনি যেমনি আছে, তেমনি রকি হীলের পাথরের সাথে শ্বেত ও মর্মর পাথরও প্রচুর পাওয়া যায়। এই দেশটির বৃহৎ পর্বত শ্রেণীর মধ্যে কারাকোরাম পর্বতমালা, হিমালয় পর্বতমালা, হিন্দুকুশ ও হিন্দুরাজ পর্বতমালা, সফেদ কোহ এবং সুলাইমান পর্বতমালা প্রভৃতি প্রধান। সারা বিশ্বে ৮ হাজার মিটার ও তদূর্ধ্ব উচ্চতার যে ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ আছে তার মধ্যে ৫টিই পাকিস্তানে। এর মধ্যে কারাকোরামের কেটু পর্বতশৃঙ্গ উচ্চতার দিক থেকে পৃথিবীতে দ্বিতীয় (৮৬১১ মিটার), হিমালয়ের নাঙ্গা পর্বতের উচ্চতা ৮১২৬ মিটার। এর পরের অবস্থান হচ্ছে, যথাক্রমে— হিন্দুকুশের তিরিখমীর, হিন্দুকুশ ও কারাকোরামের মধ্যস্থানে অবস্থিত কয়োজম শৃঙ্গ, সফেদকোহের মাউন্ট শিশরাম এবং সুলেমান পর্বতমালার তখতে সোলেমান শৃঙ্খ। যারা আরব্যোপন্যাস (Arabian Nights) পড়েছেন তারা উপন্যাসটিতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অনেকগুলো পর্বতের নাম নিশ্চয়ই পড়ে থাকবেন।

আজাদ কাশ্মীরের নায়েবে আমীর ও আর রাহমা চেয়ারম্যান বন্ধুবর সগির কমর এবং আল খেদমতসহ পাকিস্তানের দ্বীনি ভাইদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ যে তাদের সহযোগিতা ও আতিথেয়তায় আমরা মার্গালা হিল, মারী ও নাথিয়া গলির বিস্তৃত অঞ্চল সফর করতে পেরেছি। এ দুটি স্থানের চূড়ায় উচ্চতা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০০ ফুট। রাস্তাগুলোর নির্মাণশৈলী এবং রক্ষণাবেক্ষণ চমৎকার। এটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্যাপার ডিভিশনের কৃতিত্ব। মারী ও নাযিয়া গলি সফরকালে আমরা আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে পাহাড়কে যেমন ঘুমাতে দেখেছি তেমনি মেঘের কোলে রোদকে হাসতে দেখে বৃষ্টিকেও পালাতে দেখেছি। (চলবে)