১৫ মে। ফিলিস্তিনি জাতির ইতিহাসে এটি কোনো সাধারণ দিন নয়; এটি শোকের দিন, স্মৃতির দিন, প্রতিরোধের দিন। আরবিতে নাকবা শব্দের অর্থ “মহাবিপর্যয়”। ১৯৪৮ সালের এ দিনে ফিলিস্তিনিদের জন্য শুরু হয়েছিল এমনই এক মানবিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়, যার অভিঘাত আজও মধ্যপ্রাচ্যকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতি বছর ১৫ মে বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনিরা নাকবা দিবস পালন করে নিজেদের হারানো ভূমি, ভেঙে যাওয়া পরিবার, নিশ্চিহ্ন হওয়া গ্রাম এবং রাষ্ট্রহীন জীবনের স্মৃতি ধারণ করে। নাকবা কেবল অতীতের কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান বাস্তবতা। বর্তমানে দৃশ্যমান গাজার ধ্বংসস্তূপ, পশ্চিম তীরে অব্যাহত বসতি সম্প্রসারণ, জেরুজালেমে উচ্ছেদ অভিযান এবং লাখো শরণার্থীর অনিশ্চিত জীবন সে নাকবার ধারাবাহিকতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

নাকবার প্রেক্ষাপট নিয়ে বলতে গেলে ইতিহাসে ফিরতে হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপে ইহুদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা জায়নবাদ-এর উত্থান ঘটে। থিওডর হেইজেলের নেতৃত্বে এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ইহুদিদের জন্য একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ১৮৯৭ সালে প্রথম জায়নিষ্ট কংগ্রেসে এ ধারণা আনুষ্ঠানিক রূপ পায় এবং ফিলিস্তিনকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রভূমি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৭ সালে তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর কুখ্যাত বেলফোর ডিক্লারেশন জারি করেন, যেখানে ফিলিস্তিনে “ইহুদি জাতির জন্য জাতীয় আবাসভূমি” প্রতিষ্ঠার প্রতি ব্রিটেনের সমর্থন ব্যক্ত করা হয়। অথচ তখন ফিলিস্তিনের জনসংখ্যার বিপুল অংশই ছিল আরব মুসলিম ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী। পরবর্তীতে লীগ অব নেশনস ব্রিটেনকে ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেট দেয়। এ সময় ইউরোপ থেকে ব্যাপক ইহুদি অভিবাসন শুরু হয়। স্থানীয় আরবদের সঙ্গে সংঘাত বাড়তে থাকে।

জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার উদ্দেশ্যে ইউনাইটেড নেশনস পার্টিশন প্ল্যান ফর প্যালেস্টাইন অনুমোদন করে। যদিও সে সময় ফিলিস্তিনের মোট ভূমির বড় অংশ আরবদের মালিকানায় ছিল, তবুও পরিকল্পনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দ করা হয়। আরবরা এ পরিকল্পনাকে অন্যায্য মনে করে প্রত্যাখ্যান করে। এ অবস্থায় ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ডেভিড বেনগুরিয়ন ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ফলশ্রুতিতে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু যুদ্ধের আগেই বহু ফিলিস্তিনি গ্রাম আক্রমণের শিকার হয়েছিল। দেইর ইয়াসিন ম্যাসাকারের -এর মতো অসংখ্য হত্যাকাণ্ড সে সময়ে সংঘটিত হয় যা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। শত শত গ্রাম ধ্বংস করা হয়, হাজার হাজার মানুষ নিহত হয় এবং প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হয়। ফিলিস্তিনিরা একে বলে নাকবাÑ অর্থাৎ একটি সুপরিকল্পিত উচ্ছেদ।

যারা নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়েছিল, তারা আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে। আজ তাদের উত্তরসূরিদের নিয়ে শরণার্থীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে। অনেকেই আশ্রয় নেয় জর্ডানে যেখানে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি এখনো বসবাস করছে। লেবাননের শরণার্থী শিবিরগুলো আজও দারিদ্র‍্য ও নাগরিক অধিকার সংকটে ভুগছে। সিরিয়াতে গিয়েও তারা স্থিতিশীলতা পায়নি; সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ তাদের আবারও বিপর্যস্ত করেছে। পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যাকাতেও বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে। United Nations Relief and Works Agency for Palestine Refugees in the Near East-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিবন্ধিত ফিলিস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখের বেশি। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলোÑতারা কি আর কখনও ঘরে ফিরতে পারবে?

কেননা নাকবার মতো আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। নাকবা ১৯৪৮ সালে থেমে যায়নি। ৬ দিনের যুদ্ধের পর বরং ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এরপর থেকে অবৈধ বসতি স্থাপন, বাড়িঘর ভাঙা, অবরোধ, সামরিক অভিযান এবং নিয়মিত সহিংসতা ফিলিস্তিনি জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার এসব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। বিশেষত, গাজা উপত্যকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত কারাগারগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। নাকবার সবচেয়ে গভীর ক্ষত কেবল ভূখণ্ড হারানো নয়; এটি স্মৃতি হারানোরও ইতিহাস। ফিলিস্তিনের বহু ঐতিহাসিক গ্রাম, মসজিদ, গির্জা, জলপাই বাগান, লোকসংগীত, মৌখিক ইতিহাস এবং পারিবারিক দলিল ধ্বংস হয়ে গেছে। ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি পোশাক থোব, সূচিশিল্প, লোকসংগীত এবং রান্নার সংস্কৃতি দখল ও স্থানচ্যুতির ফলে সংকটে পড়েছে। মেহমুদ দরবেশের কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে হারানো ভূমির বেদনা। ঘাসসান কানাফানির সাহিত্যকর্মে উদ্বাস্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। মূলত ফিলিস্তিনি খাদ্য ঐতিহ্য যেমন মুসাখান, মাকলুবা এবং জলপাইভিত্তিক কৃষি সংস্কৃতিও সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নাকবার ইতিহাস ১৯৪৮ সালে শুরু হলেও বহু ফিলিস্তিনি গবেষক, মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, গাজা ও পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতি নাকবারই ধারাবাহিক রূপ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক অভিযান এ বাস্তবতাকে আরও নগ্নভাবে সামনে এনেছে। মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের ছোট ভূখণ্ডে গাজা যুদ্ধের আগে প্রায় ২৩ লাখ মানুষের বসবাস ছিল, যা পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবেও স্বীকৃত ছিল। ২০০৭ সাল থেকে ইসরাইলের কঠোর অবরোধের কারণে এ অঞ্চল আগে থেকেই অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটে ছিল। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে গাজার অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘অকার্যকর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের পরবর্তী সামরিক অভিযানে গাজার অবকাঠামো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজার হাজার আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। গাজার হাসপাতালগুলোর বড় অংশ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। গাজার অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো সময় বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

বহু পরিবারকে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। এমনকী “নিরাপদ অঞ্চল” হিসেবে ঘোষিত হয়েছে এমন সব এলাকাতেও হামলার অভিযোগ উঠে। শুধু মানবিক ক্ষয়ক্ষতিই নয়, শিক্ষা খাতও ভয়াবহভাবে আক্রান্ত হয়েছে। বহু স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র এবং গ্রন্থাগার ধ্বংস হয়েছে। ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদরা একে “scholasticide” বলে আখ্যা দিয়েছেনÑঅর্থাৎ একটি জাতির জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়া।

সাংবাদিকদের মৃত্যুর সংখ্যাও নজিরবিহীন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষক সংস্থার তথ্যমতে, এ সংঘাতে বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যা আধুনিক সংঘাতের ইতিহাসে উদ্বেগজনক নজির। গাজা যুদ্ধে ইসরাইল ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ সংঘটন করে যার প্রতিক্রিয়ায় International Court of Justice-এ দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপন করে মামলা দায়ের করে। এ আদালত ইসরাইলের কর্মকান্ডকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরাইলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখভা যায়নি। অন্যদিকে, ইসরাইলের সকল অপরাধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্লজ্জ সমর্থন ও সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আনীত প্রস্তাবনা নিয়ে বারবার ভেটো প্রদান এবং আরব বিশ্বের সীমিত কার্যকর প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গাজার বহু শিশু আজ পরিবার হারিয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থা হারিয়েছে, চিকিৎসার সুযোগ হারিয়েছে এবং স্বাভাবিক শৈশব হারিয়েছে। ইউনিসেফ এরই মধ্যে একাধিকবার সতর্ক করেছে যে, একটি পুরো প্রজন্ম গভীর মানসিক ট্রমা নিয়ে বেড়ে উঠছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিরা কেবল তাদের ভূমি হারিয়েছিল। আর বর্তমানে গাজার মানুষ শুধু জীবন নয়, তাদের ভবিষ্যৎ, প্রতিষ্ঠান, স্মৃতি এবং সামাজিক কাঠামো হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এই কারণেই নাকবা অনেকের কাছে কেবল ইতিহাসের অধ্যায় নয়; এটি এক চলমান বাস্তবতা, যেখানে ধ্বংসের ভাষা বদলেছে, কিন্তু বেদনার চরিত্র বদলায়নি।

প্রতি বছর ১৫ মে নাকবা দিবস ঘিরে ফিলিস্তিনি জনগণ, মানবাধিকার কর্মী এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মনে একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে-বিশ্ব কি এখনো ফিলিস্তিনের ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে স্বীকার করতে প্রস্তুত? বিশেষ করে, নাকবার ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্র আদৌ কি মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়ভিত্তিক কোনো নীতি প্রণয়ন করতে পারে? ওয়াশিংটন দশকের পর দশক ধরে জায়নবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রকে বিপুল সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া রাষ্ট্রগুলোর একটি হলো ইসরাইল। এ সহায়তা শুধু সামরিক ভারসাম্যই বদলায়নি, বরং ফিলিস্তিনি প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপও অনেকাংশে দুর্বল করেছে।

এভাবে যদি একটি পক্ষের অন্যায়কে সকল বৈধতা ও আইনের তোয়াক্কা না করে মেনে নেয়া হয় কিন্তু অন্য পক্ষের ইতিহাসকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে ন্যায়সঙ্গত শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিগত ৮০ বছরের ভূমিকায় এটি স্পষ্ট যে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র কেবল মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং সংঘাতের একটি প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক পক্ষ, যারা মূলত বছরের পর বছর সংঘাত জিইয়ে রেখেছে। কেননা, এটি সর্বজনস্বীকৃত বাস্তবতা, যুক্তরাষ্ট্র পাশে না থাকলে দখলদার রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল এতদিন টিকেই থাকতে পারতো না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর গাজা পুনর্গঠন ও যুদ্ধ-পরবর্তী কাঠামো নিয়ে নতুন উদ্যোগের কথা বলা হলেও, সমালোচকদের মতে, এটি মূল সংকট-দখলদারিত্ব, বাস্তুচ্যুতি ও রাষ্ট্রহীনতার প্রশ্নগুলো-এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র।

আশার জায়গা হলো মার্কিন কংগ্রেসম্যান রাশিদা তালিব মার্কিন কংগ্রেসে টানা পঞ্চমবারের মতো নাকবাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তাঁর প্রস্তাবে শুধু ১৯৪৮ সালের বিপর্যয় নয়, “চলমান নাকবা” এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকারকেও স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এ প্রস্তাবের সমর্থক সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরে পরিবর্তিত জনমতের ইঙ্গিত বহন করে। ঐতিহাসিকভাবে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান এর প্রশাসন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেসনে গৃহীত রিজোলিউশন ১৯৪-কে সমর্থন করেছিল, যেখানে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল। অথচ এই প্রস্তাবনাও আজ অবধি বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান প্রশাসন ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলেও মূলত তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন এর আমল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থন যত গভীর হয়, নাকবার ঐতিহাসিক বাস্তবতা তত বেশি আড়ালে চলে যায়। শুধু রাষ্ট্র নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। জাতিসংঘ নাকবা-পরবর্তী সময়ে বহু প্রস্তাব গ্রহণ করলেও সেগুলোর বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবতা হলো, নাকবাকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে কেবল অতীতের অন্যায়কে স্মরণ করা নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতাকে বোঝারও পূর্বশর্ত। কারণ ১৯৪৮ সালে যে বাস্তুচ্যুতি শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা আজও পশ্চিম তীরে ও গাজায় ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান।

বিশ্ব যদি নাকবাকে শুধুমাত্র ইতিহাসের একটি ‘বিতর্কিত অধ্যায়’ হিসেবে দেখে, তাহলে ফিলিস্তিনের বর্তমান ট্র‍্যাজেডিও একদিন শুধু আর্কাইভের নথিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। আজ যখন গাজায় যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ব্যর্থতা আলোচনায়, তখন নাকবা দিবস শুধু ইতিহাস স্মরণের দিন নয়। বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে একটি জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে। যে শিশু আজ শরণার্থী শিবিরে জন্ম নিচ্ছে, সে তার দাদা-দাদির গ্রামের নাম জানে, কিন্তু কখনও সে গ্রাম দেখেনি। বহু পরিবার এখনো তাদের বাড়ির চাবি সংরক্ষণ করে রেখেছে, একদিন ফিরে যাওয়ার আশায়। নাকবা তাই কেবল ফিলিস্তিনের ইতিহাস নয়; এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পরীক্ষাও। যতদিন উচ্ছেদ, দখল এবং রাষ্ট্রহীনতা চলবে, ততদিন ১৫ মে কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়-এটি বিশ্ব বিবেকের সামনে এক অনবরত প্রশ্ন হয়ে থাকবে: ইতিহাসের এই দায় কি কখনও শোধ হবে?