কিশোর তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য মানুষের কাক্সিক্ষত প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হওয়ার পর সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেছিল- এবার হয়তো বাংলাদেশ দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, ভয়ভীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত হবে। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। ক্ষমতার পালাবদল হলেও চাঁদাবাজির অপসংস্কৃতি দূর হয়নি। হাটবাজার থেকে শুরু করে পরিবহন খাত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবখানেই চাঁদাবাজির পুরোনো দানব নতুন মুখোশ পরে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ঢাকার ফুটপাত থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত সর্বত্র যেন ফিল্মি স্টাইলে চাঁদাবাজি চলছে। থানা শহর, জেলা শহর কিংবা রাজধানী- যেখানে ফুটপাত আছে, যেখানে হকার আছে, সেখানেই দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি ‘‘ওপেন সিক্রেট’’। এই অবৈধ টাকার ভাগ কার কার পকেটে যায়, তা কারও অজানা নয়। সব জেনেও মানুষ নীরব। কারণ প্রতিবাদ করলেই জীবন নিয়ে টানাটানি পড়বে- এই আতঙ্ক সবার মনে। ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রিকশাচালক, সিএনজি চালক কিংবা ভিক্ষুক- কেউই আজ চাঁদাবাজদের কবল থেকে মুক্ত নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো সমাজের একটি অংশ ধীরে ধীরে এই অস্বাভাবিক বাস্তবতাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। ফলে চাঁদাবাজি আজ শুধু একটি অপরাধ নয়; বরং এটি এক ধরনের সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি নির্মম বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে- স্বাধীনতার পর থেকে যখনই ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণও কেবল এক গোষ্ঠী থেকে অন্য গোষ্ঠীর হাতে স্থানান্তরিত হয়েছে। এ যেন পুরনো মদ নতুন বোতলে ঢেলে পরিবেশন করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদ পতনের পরও যখন একই অপসংস্কৃতি বহাল থাকে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে-এটি কোনো একক রাজনৈতিক দলের একক সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রশ্রয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক ভয়াবহ ব্যাধি। এ দেশে চাঁদাবাজির ইতিহাস নতুন নয়। ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় লাঠিয়াল বাহিনী কিংবা পাকিস্তান আমলে প্রভাবশালীগোষ্ঠী ক্ষমতার ছায়ায় থেকে দুর্বল মানুষের ওপর জুলুম ও অবৈধ অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছিল। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির সুযোগে এই অপসংস্কৃতি আরও সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একশ্রেণির সুবিধাভোগী চক্র ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি কোনো কোনোগোষ্ঠী ‘‘বিপ্লবের তহবিল’’ সংগ্রহের নামে জোরপূর্বক অর্থ আদায়কেও এক ধরনের আদর্শিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সময়ের পরিক্রমায় এই ধারাবাহিকতাই আজকের প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজির ভিতকে আরও শক্তিশালী করেছে।
মূলত চাঁদাবাজি হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক চরম বিষফল। এ কারণেই দেশে সরকার বদলায়, রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় চট্রগ্রাম ১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের বিএনপি প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য সরওয়াল জামাল নিজামের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানান। কিন্তু দেশের প্রচলিত আইনে যা স্পষ্ট অপরাধ, তা বন্ধ করতে কেন ‘অনুরোধের’ আশ্রয় নিতে হবে? সেখানে রাষ্ট্রের কঠোর আইন ও প্রশাসনের ভূমিকা কোথায়? রাজনৈতিক নির্দেশে যদি সাময়িকভাবেও চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব হয়, তবে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সদিচ্ছায় তা স্থায়ীভাবে নির্মূল করা অসম্ভব হবে কেন? সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, চাঁদাবাজির মতো জঘন্য অপরাধকে ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে তুলনা করে সামাজিক বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির একটি টকশোতে দেওয়া বক্তব্য-‘‘যাকাতের চেয়ে চাঁদাবাজি ভালো’’- চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। যাকাত ইসলামের একটি ফরজ বিধান, যা সমাজে সাম্য, মানবিকতা ও দারিদ্র্য বিমোচন নিশ্চিত করে। এমন পবিত্র বিধানের সঙ্গে দণ্ডনীয় অপরাধের তুলনা করা রাজনৈতিক নৈতিকতার চরম দেউলিয়াত্ম্য ছাড়া আর কী হতে পারে? ক্ষমতার অহংকার মানুষকে কতটা বিবেকহীন ও সংবেদনহীন করতে পারে, এই বক্তব্য তারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ‘‘তবে আশার কথা হলো, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা.শফিকুর রহমান সম্প্রতি মিরপুর-১ এর শাহআলী পাইকারি কাঁচাবাজার পরিদর্শনে গিয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি সোজাসুজি বলেছেন- চাঁদাবাজরা আফ্রিকার জঙ্গল থেকে আসে না; আমাদের চারপাশে ওঠা-বসা করা চেনা লোকেরাই এ অপরাধের সাথে জড়িত। তাদের পরিচয় আমরা সবাই কম বেশি জানি। তিনি মনে করিয়ে দেন, আইনপ্রণেতারা আন্তুরিক হলে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সংসদের ৩০০ সদস্য যদি আন্তরিক হন, একযোগে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তবে কোনো অপরাধীরই পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। তাঁর এই বক্তব্য আবারও প্রমাণ করে যে, চাঁদাবাজি নির্মূলের আসল চাবিকাঠি হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা। নাগরিক হিসেবে আমরাও এই গণবিরোধী সংস্কৃতির চিরতরে অবসান চাই।’’
চাঁদাবাজদের সবচেয়ে লাভজনক ও নিরাপদ ক্ষেত্র হচ্ছে পরিবহন খাত, শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক এলাকা, বাস ও নৌ-টার্মিনাল, বালুমহাল এবং জনাকীর্ণ হাটবাজার। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তানে গেলেই এই অরাজকতার নগ্ন চিত্র চোখে পড়ে। জিরো পয়েন্ট থেকে জিপিও এবং বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে গোলাপশাহ মাজার পর্যন্ত পুরো এলাকার ফুটপাত যেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সেখানে ফুটপাতে হকারি করতে হলেও এলাকাভেদে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘‘পজিশন ফি’’ দিতে হয়। এই অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে দোকান বসানো তো দূরের কথা, সেখানে দাঁড়িয়ে ব্যবসা করার ন্যূনতম অধিকারটুকুও থাকে না। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শুধু গুলিস্তান এলাকা থেকেই প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। অর্থাৎ একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামের উপার্জনের বড় একটি অংশ প্রতিদিনই এভাবে চলে যাচ্ছে কিছু পরজীবী চক্রের পকেটে। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারের চিত্রও ভিন্ন নয়; বরং আরও ভয়াবহ। সেখানে একই জায়গার জন্য দিনে ও রাতে তিন দফায় ভিন্ন পক্ষকে চাঁদা দিতে হয়- এমন নির্মম স্বীকারোক্তি ঢাকা ১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলনের মুখ থেকেই এসেছে। একজন সাধারণ ব্যবসায়ীকে যখন প্রতিদিন এভাবে বহুমুখী শোষণের শিকার হতে হয় তখন তার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ে পণ্যের বাজারদরে। ফলে পাইকারি বাজার থেকে পণ্যটি যখন খুচরা বাজারে পৌঁছায় তখন এর দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষকেই বাড়তি দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে এই অবৈধ চাঁদাবাজির পুরো আর্থিক বোঝা বহন করতে হয়।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির চিত্র আরও ভয়াবহ। বিভিন্ন মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। দেশের অন্যান্য জায়গার মতো কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কে তথাকথিত ‘‘টোকেন সিস্টেম’’-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় চলছে। ভুক্তভোগী চালকদের ভাষ্যমতে, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা না দিলে ভুয়া মামলা, গাড়ি আটকে রাখা কিংবা নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। কিছু অসাধু ব্যক্তির সীমাহীন অর্থলিপ্সা আজ পুরো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পুলিশ ও প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী- চাঁদাবাজির এই অদৃশ্য জাল এখন সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে বিস্তৃত। হাটবাজার, মাছঘাট, বালুমহাল, সরকারি-বেসরকারি নির্মাণপ্রকল্প, নৌঘাট থেকে শুরু বাসস্ট্যান্ড-কোনো ক্ষেত্রই আজ এর বাইরে নয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, সশরীরে হামলা, প্রাণনাশের ভয়ভীতি কিংবা প্রকাশ্য হয়রানির মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এই অপরাধী চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা প্রভাবশালীদের যোগসাজশ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এরা গিরগিটির মতো রং বদলায়; কিন্তু বদলায় না এদের চরিত্র কিংবা অপকর্মের ধরন। তবে এই ঘোর অন্ধকারের মাঝেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কিছু দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপে নেওয়া হচ্ছে। র্যাবের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে ৩ হাজার ৮৪৯ জন চাঁদাবাজদের একটি নিরপেক্ষ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় রয়েছে ১ হাজার ২৫৪ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় আরও ২ হাজার ৫৯৫ জন।
বিভাগ ও জেলাভিত্তিক এই তালিকায় কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চাঁদাবাজের নাম উঠে এসেছে। তবে শুধু এই তালিকা তৈরি করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন চাঁদাবাজদের পেছনে থাকা রাজনৈতিক আশ্রয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির মূলোৎপাটন করা। তা না হলে এই তালিকা কেবল কাগজের দলিল হিসেবেই থেকে যাবে এবং মূল হোতারা চিরকালই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। সুতরাং কেবল সাময়িক অভিযান নয়, চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনে এই মুহূর্তে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
লেখক : প্রাবন্ধিক।