হারুন ইবনে শাহাদাত
৩৬ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ নতুন করে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের কঠিন দায়িত্ব এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ওপর। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের দিনই জনগণের মনে একটি কালো ছায়া পড়েছে। সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া থেকে বিরত থাকেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের এমপিরা দু’টি শপথই নিয়েছেন।
বিএনপি অবশ্য বার বার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে তারা জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় জনমনের অস্বস্তির কালো মেঘ কাটছে না। কথায় আছে, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। বার বার রাজনৈতিক প্রতারণার শিকার এদেশের জনগণের ভয়টা সেখানেই। গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংস্কারের জন্য আলাদা কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে, বিএনপি। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের দাবি গণভোটের রায়ের আলোকে ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করতে হবে।’ বিএনপির পাল্টা যুক্তি- ‘সংবিধানে এমন কোনো পরিষদ গঠনের বিধান নেই। এর বিকল্প হিসেবে গত ২৯ এপ্রিল সরকার একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। এ কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য বিরোধী দলের কাছে নাম চেয়েছে সরকার।’ বিরোধী দলের দাবি সংবিধানে নেই বলেই তো এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব ক্ষমতার উৎস জনগণের মতামত চাওয়া হয়েছে। গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। এখন এ রায়ের আলোকে শপথ ও সংস্কার পরিষদ গঠন না করে কমিটি গঠন জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল। সরকারের তিন মাসের কার্যকালের কালো তিলক চিহ্নগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম প্রধান কলংক দাগ। এক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধীদল ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে অগ্রসর হলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রত্যাশার পারদ অনেক ওপরে থাকতো। ৩৬ জুলাই চেতনার প্রতি সম্মানের বহিঃপ্রকাশের কারণে সরকারের প্রতি আস্থা আরো বাড়তো।
এছাড়া তারেক রহমানের সরকারের সামনে মোটা দাগে যেমন চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম ফ্যাসিস্ট পতিত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের লুট-পাটে ফোঁকলা অর্থনীতি, দুর্নীতিবাজ প্রশাসন, চাঁদাবাজি ও বাজার সিন্ডিকেটের পুরোনো সামন্তবাদী কাঠামো, সন্ত্রাস, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য খাত, অর্থপাচার ও খেলাপি ঋণে ধ্বংস ব্যাংক ব্যবস্থা, কুইক লুটের কুইক রেন্টাল নামের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, দরবেশ বাবার দরবারের সেলামিতে শূন্য শেয়ারবাজার অন্যতম।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাও প্রথম। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও এবার প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ সংসদের নির্বাচিত ৩০০ জনের মধ্যে মোট ২২০ জন এবার প্রথমবার সংসদ-সদস্য হয়েছেন। অবশ্য এর কারণও আছে-ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে দেশের নির্বাচন গিয়েছিলো নির্বাসনে। রাজনৈতিক দলের নেতাদের কারো সময় কেটেছে জেলখানায়। কারো নির্বাসনে নয় তো প্রতিহিংসামূলক মামলার শিকার হয়ে ফেরারি জীবন। ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিয়েছেন দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ প্রথম সারির পাঁচ নেতা। কারাগারে শহীদ হয়েছে সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি। বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও শহীদ হয়েছেন ফাঁসি কাষ্ঠে। কারানির্যাতনে ইন্তেকাল করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
সে শোককে শক্তিকে পরিণত করে নবীনের নবোদ্যম ও প্রবীণের প্রজ্ঞায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে প্রাণবন্তভাবেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার কর্মপরিকল্পনার রূপরেখার তুলে ধরেছেন।
কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিন ১ এপ্রিল বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে বিএনপি ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭,৮১৪ টি নারীপ্রধান পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’ কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা প্রদানে সরকার কৃষক কার্ড প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ০৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে পাইলটিং করা হবে। এছাড়া, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে ঈদুল ফিতরের পূর্বেই ৩২৯৫ জন ইমাম, ২৯৭৫ জন মুয়াজ্জিন, ২৬০৪ জন খাদেম এবং হিন্দু মন্দিরের ১১৪ জন পুরোহিত, ৮৩ জন সেবাইত, বৌদ্ধ বিহার, প্যাগোডার ১৫ জন অধ্যক্ষ ও ১৬ জন উপাধ্যক্ষসহ সর্বমোট ৯১০২ (নয় হাজার একশত দুই)জন উপকারভোগীর ব্যাংক একাউন্টে সম্মানী প্রেরণ করা হয়েছে। ‘ই-হেলথ কার্ড প্রদান’ বিষয়ে পাইলটিং কার্যক্রমের আওতায় খুলনা জেলায় ২৫ লাখ ই-হেলথ্ কার্ড প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আগামী ৫ বছরে ২০,০০০ কি.মি. খাল খনন, পুনঃখনন কর্মসূচি গত ১৬ মার্চ, ২০২৬ হতে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় ১২০৪ কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন করবে। এছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জুন ২০২৬ পর্যন্ত কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা), টিআর (টেস্ট রিলিফ)-এর মাধ্যমে ১৫০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, সংস্কার করা হবে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বনায়ন সৃজনের জন্য ইতোমধ্যে ১ কোটি ৫০ লক্ষ বিভিন্ন প্রজাতির চারা উৎপাদন করা হয়েছে। উৎপাদিত চারাসমূহ চলতি বছর আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে।’
এ অর্থবছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান করা হবে, ৩৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে এবং ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে ইটালিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষা প্রদান করা হবে। ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জুন, ২০২৬ এর মধ্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
এমনকি সারাদেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কর্মকৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাই-টেক, সফটওয়্যার পার্ক ও আইসিটি সেন্টারসমূহ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে Paypal-এর কার্যক্রম আরম্ভে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে বেতন কাঠামোর আওতায় জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ক্রীড়া ভাতা’ চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এই ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যার মধ্যে প্রথম ধাপে ১২৯ জন আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ০৩ লক্ষ হতে ১০ লক্ষ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
১৮০ দিনের কর্মসূচি বিশ্লেষণ ও মানুষের চাওয়া : প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘প্রত্যেক সরকার প্রথম ১০০ দিনের একটি কর্মসূচি নেয়। আমাদের সরকার সে কর্মসূচিটি একটু বৃহত্তর পরিসরে ১৮০ দিনের জন্য গ্রহণ করেছে। ১৮০ দিনের কর্মপরকল্পনা, জনগণের প্রত্যাশা এবং বিগত তিন মাস ৯০ দিনের বাস্তবায়ন বিশ্লেষণ করে রাজনীতি বিশ্লেষকরা মিশ্র মতামত ব্যক্ত করেছেন। মানুষ আসলে কার্ড বা অনুদান নয়। তারা নিজ হাতে কাজ করে খেতে চায়। কাজ ও জীবনের নিরাপত্তা এবং জীবনযাপনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয় এমন মজুরি চায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে চায় ন্যায্য মূল্যে। বাজার সিন্ডিকেটের কারণে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন অস্থিরতা থেকে মুক্তি চায়। তাদের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে অবশ্যই দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন নিশ্চিত করতে অন্ধ দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির লাগাম টানতে হবে। তা না হলে সরকারের কোন কর্মপরিকল্পনাতেই জনগণের প্রয়োজন পূরণ হবে না। জনপ্রিয়তার পারদ ওপরে উঠবে না। বরং দিন দিন নীচের দিকে নামবে। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর জনগণ ভাবতে শুরু করেছে এ দেশ ‘আমাদের দেশ’। মানে তারাই দেশের আসল মালিক। কারা দেশ পরিচলানা করবে তা নির্ধারণ তারাই করবে। তাদের ভোটে সরকার নির্বাচিত হবে । সরকারের লক্ষ্য হবে দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করা।
আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রে আসলে কেউ রাজা-মহারাজা কিংবা সামন্ত প্রভু নন। বিশেষ করে যারা জনগণের ভোটে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত সরকার গঠন করেন এবং যারা মেধা-যোগ্যতার দৌড়ে এগিয়ে থাকার কারণে কর্মকমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান, একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রে তারা সবাই সার্ভেন্ট বা সেবক। তাদের দায়িত্ব সাভেন্ট হিসেবে জনগণের সার্ভিস (সেবা করা) দেয়া। তাই তো উচ্চ পদের কর্মকর্তারা সংবিধানের ভাষায় সবাই কর্মচারী। তাদের নিয়োগের দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের নাম পাবলিক সার্ভিস কমিশন। কিন্তু চেয়ার বসার পর যখন উভয় পক্ষ রাজনৈতিক নেতা ও আমলা নিজেরকে মালিক এবং জনগণকে প্রজা ভাবতে শুরু করে সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হওয়া শুরু হয়ে তখনই। ৩৬ জুলাই বিপ্লব পরবর্তী তারেক রহমানের সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা -পুরানো এ বন্দোবস্ত ভেঙে একটি নতুন বাংলাাদেশ। একান্তই তাদের নিজেরদের দেশ। যেখানে থাকবে না রাজা-প্রজার ব্যবধান। এ প্রত্যাশা পূরণের সাধ্য কোন কার্ডের নেই। এজন্য প্রয়োজন সুশাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।