মরহুম খান আতাউর রহমানের কথা ও সুরে-
‘হায়রে আমার মন মাতানো দেশ
হায়রে আমার সোনা ফলা মাটি
রূপ দেখে তোর কেন আমার
নয়ন ভরে না
তোরে এতো ভালবাসী তবু
পরান ভরে না’।
সত্যিই প্রাণ জুড়ানো ও মন মাতানো আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। করুণাময়ের কৃপায় জন্মেছি প্রিয় বাংলাদেশে। এদেশের আলো-বাতাসেই বেড়ে উঠেছি; পরিপুষ্ট হয়েছি আমরা। শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের উত্তাল দিনগুলো পেড়িয়ে এখন পৌঢ়ত্বে উপনীত হয়েছি আমি। মূলত, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে এদেশের জন্যই পছন্দ করেছেন। এ ভূখণ্ডে যত ইতিবাচক দিক রয়েছে সে সবের সুসম ব্যবহার এবং উপকৃত হওয়ার অধিকার আমাদের যেমন রয়েছে; ঠিক তেমনি সমস্যাগুলোও সমাধানে অবদান রাখাও সকল নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। বস্তুত, এজন্যই আমাদেরকে এখানে নিয়োজিত করা হয়েছে। তাই কারো পক্ষে পলায়নপর হওয়ার সুযোগ নেই বরং জীবনের শেষটুকু দিয়ে হলেও এ ভূখণ্ডের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব মান-মর্যদা, স্বকীয়তা বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকা সকলের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, কবির ভাষায় এদেশ সকল দেশের রাণী।
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এমনিতেই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি বরং ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামের এক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে। এ জন্য দিতে হয়েছে অগণিত প্রাণ। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক পেরিয়ে এবং নানাবিধ চড়াই-উৎরাইয়ের পথ ধরেই আজকের এ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ; আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। মূলত, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে যুদ্ধ নামের প্রহসনে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর ১৯০ বছর ভারতীয় উপমহাদেশ ঔপনিবেশিক অপশাসন-দুঃশাসনের কবলে ছিলো। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টির পৃথক জাতিসত্তার অভ্যুদয়ের মাধ্যমে সে অবস্থার অবসান ঘটেছে। এ পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তথা সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রদেশ ছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়েনি। শাসকগোষ্ঠীর নৈতিক ও আদর্শিক দেউলিয়াত্বের কারণেই সদ্যভূমিষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অখণ্ড রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, অনেক ত্যাগ ও কুরবানির বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলেও রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে আমরা স্বাধীনতার সুফলগুলো পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি বা এখনো পারছি না। আক্ষেপটা আমাদের সেখানেই।
বস্তুত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ। অপরূপা এ দেশের সবুজ বন-বনানী, সুবিশাল ম্যানগ্রোভ বনরাজি, নদনদী, শ্যামল পাহাড়, বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত, প্রাচীন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে আকৃষ্ট করে আসছে। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুবই মনোমুগ্ধকর। তাই রূপমুগ্ধ, বিস্ময়-পুলকিত কবি তার আবেগ-স্নিগ্ধ উচ্চারণে বাংলাকে বলেছেন ‘রূপসী বাংলা’। বস্তুত ছয় ঋতুর দেশ এ রূপসী বাংলাদেশ। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশটি যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক যাদুঘর।
বস্তুত, আমাদের প্রিয় জন্মভূমি সুজলা, সুফলা ও শস্য-শ্যামলা একটি অনন্য সাধারণ দেশ। সবুজ পাহাড়, নদীমাতৃক রূপ এবং বৈচিত্র্যময় ঋতুচক্রের মেলবন্ধন এ দেশের প্রকৃতিকে এক জাদুকরী রূপ দান করেছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পৃথিবীর বৃহত্তম অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন, যা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল এবং এর জীববৈচিত্র্য ও নদী-খালের মায়াবী রূপ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এবং প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের নীল জলরাশি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। শ্রীমঙ্গল ও সিলেটের বিস্তীর্ণ সবুজ চা বাগান, জাফলংয়ের পাথুরে নদী এবং রাতারগুল জলাবন বাংলাদেশের অন্যতম নান্দনিক প্রাকৃতিক স্থান। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির মেঘে ঢাকা সবুজ পাহাড়, কাপ্তাই হ্রদ ও বিভিন্ন জলপ্রপাত পাহাড়প্রেমীদের স্বর্গ। গ্রীষ্মের প্রখরতা, বর্ষার সতেজ রূপ, শরতের নীল আকাশ আর শীতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রকৃতি যেন নিজ হাতে প্রতি ঋতুতে নতুন সাজে সাজায় বাংলাদেশকে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলা অঞ্চল, বঙ্গ, বাংলা, বঙ্গদেশ বা বাংলা দেশ হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরপূর্বে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অঞ্চল। এ বঙ্গ বর্তমানে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এবং আরেকটি ভারতীয় রাজ্য আসামের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। বঙ্গ ভঙ্গের আগে পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গ মিলে একটি আলাদা রাজ্য গঠিত হয়েছিলো। পরে ভারত বিভক্তের সময় পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের সাথে যুক্ত করা হয় এবং তখন থেকেই পূর্ব বঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অংশ (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য হিসেবে যুক্ত হয়। কিন্তু পূর্বে অবিভক্ত বাংলার বেশ কিছু অঞ্চল (ব্রিটিশ রাজ ও মুঘল আমলে) বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের পার্শ্ববর্তী ভারতীয় রাজ্য বিহার, আসাম ও ওড়িশা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ বাংলার অধিবাসীরা বাঙালি জাতি হিসেবে অভিহিত হয়ে থাকেন এবং বাংলা ভাষা এই অঞ্চলের প্রধান ভাষা।
বাংলার এ অঞ্চলটিতে বিশ্বের অন্যতম উচ্চ ঘনত্বের জনসংখ্যা বসবাস করেন। অঞ্চলটি অধিকাংশ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদী ব-দ্বীপ বা গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে অবস্থিত, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ। এ অঞ্চলের জনজীবন মূলত গ্রাম্য হলেও কলকাতা, ঢাকা, বরিশাল, চট্রগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, আগরতলা, শিলচরের মতো কয়েকটি মহানগর এই বাংলা অঞ্চলে অবস্থিত। এ অঞ্চলের অধিবাসীরা ভারতীয় সমাজের সমাজ-সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংঘটিত স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাচীন বাংলায় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য মূলত প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর উপর নির্ভরশীল ছিল। তৎকালীন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সরল। প্রাচীন বাংলায় সোনার বাংলা হিসেবে খ্যাত এ অঞ্চলে নদীমাতৃক পলিমাটির কারণে প্রচুর ফসল ফলত, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। সে সময় মানুষের চাহিদা ছিল সীমিত। প্রকৃতির সান্নিধ্যে, মাটির ঘরে বসবাস ও পুকুরের মাছ, শাকসবজি ও ধান উৎপাদন ছিল সুখের মূল ভিত্তি। ধর্মীয় উৎসব; মেলা এবং উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সৌন্দর্যবোধের চর্চা মানুষের মনকে উদার ও আলোকিত করত, যা এক ধরনের মানসিক সুখ এনে দিত। বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঘরবাড়ি তৈরি করা হতো, যা আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতো।
১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুলতানী আমল বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় সময়। এ সময়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের ফলে মানুষের জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ যুগকে অনেক ঐতিহাসিক বাংলার ‘সুবর্ণযুগ’ বা শান্তি ও স্থিতিশীলতার সময় হিসেবে অভিহিত করেন। দিল্লি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন সুলতানেরা বাংলা শাসন করতেন, ফলে স্থানীয় স্বার্থ রক্ষিত হতো। সুলতানরা প্রজাহিতৈশী ছিলেন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। বিশেষ করে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং রুকনউদ্দিন বরবক শাহের শাসনামল শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত ছিল। শক্তিশালী শাসনব্যবস্থার কারণে মানুষ মোটামুটি নিরাপদ জীবনযাপন করত। সে সময় বাংলা ছিল কৃষিপ্রধান, এবং সুলতানরা কৃষির প্রসারে ও সেচ ব্যবস্থায় সহায়তা করতেন। বস্ত্র শিল্প; বিশেষ করে মসলিন ও অন্যান্য শিল্প বিকশিত হয়েছিল। নদী ও সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল ছিল। উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাণিজ্যের প্রসারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য জনগণের সাধ্যের মধ্যে ছিল। সুলতানরা সোনা ও রুপার মুদ্রা চালু করেছিলেন, যা বাণিজ্যের প্রসারে সাহায্য করত। সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক উন্নতি হয়। হিন্দু-মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের মিলনমেলা ও উদার পরিবেশ সমাজে সুখ ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। উন্নত স্থাপত্যশিল্প (যেমন: মসজিদ, মিনার, দরগাহ) গড়ে ওঠে, যা তৎকালীন সমৃদ্ধির প্রতীক। সুলতানরা ধর্মীয় উদারতা প্রদর্শন করতেন, ফলে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ভালো ছিল। যদিও অধিকাংশ মানুষ গ্রামে মাটির তৈরি সাধারণ ঘরে বাস করত, তবুও কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থায় খাদ্যের অভাব ছিল না। সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি বিরাজ করতো। সামগ্রিকভাবে, সুলতানী আমল ছিল বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বিকাশের একটি সোনালী সময়, যেখানে সাধারণ মানুষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করত।
মুঘল আমলে বাংলা সুবাহ ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধশালী ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় অঞ্চল। একে প্রায়শই ‘জাতিসমূহের স্বর্গরাজ্য’ (Paradise of Nations) এবং বাংলার ‘সুবর্ণ যুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এ সময়ে বাংলা কৃষি, শিল্প এবং বাণিজ্যে অভাবনীয় উন্নতি করেছিল। মুঘল আমলে বাংলা ছিল বিশ্বের অন্যতম ধনী অঞ্চল এবং শিল্পোন্নত এলাকা। বস্ত্র উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ এবং কৃষি পণ্য রপ্তানিতে বাংলা ছিল অগ্রগামী। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার উর্বর ভূমিতে প্রচুর পরিমাণে ধান, আখ, গম ও মশলা উৎপন্ন হতো, যা মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করত। তৎকালীন ঢাকা ছিল মসলিন বস্ত্রের জন্য বিশ্বখ্যাত। এ সময় বাংলার সুতি ও রেশম বস্ত্রের বিপুল চাহিদা ছিল, যা ইউরোপীয় বণিকদের আকর্ষণ করত। মুঘল শাসনামলে বাংলায় শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। শায়েস্তা খানের আমলে টাকার মান এতটাই ভালো ছিল যে, সে সময় ১ টাকায় ৮ মন চাল পাওয়া যেত। মুঘল সংস্কৃতির সাথে বাংলার স্থানীয় সংস্কৃতির মিলনে একটি অনন্য সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছিল। পোশাক-আশাকে পোশাকে, খাবার-দাবারে মুঘল প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময়ে ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও রাজমহল শহরগুলো সুদৃশ্য স্থাপত্যে সেজে ওঠে। মসজিদ, দুর্গ, বাগান এবং আরামদায়ক ইমারত নির্মিত হয়। যদিও গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন ছিল সহজ-সরল, তবুও সামগ্রিকভাবে মুঘল আমল বাংলার ইতিহাসে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের এক সোনালী অধ্যায় হিসেবে গণ্য করা হয়।
নবাবী আমলে (১৭১৭-১৭৫৭) বাংলা সুবাহ ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যশালী প্রদেশ, যা অনেক সময় ‘জাতিসমূহের স্বর্গরাজ্য’ বা বাংলার স্বর্ণযুগ হিসেবেও পরিচিত। এ সময়ে বিশেষ করে মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন এবং আলীবর্দী খানের শাসনামলে বাংলায় শান্তি, শৃঙ্খলা ও ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বিরাজ করত। এ সময় বাংলা এশিয়া থেকে ডাচ আমদানির হিস্যা বহন করত এবং শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষিতে অভাবনীয় উন্নতি করে। সাধারণ প্রজা মোটের উপর সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করত। খাদ্যশস্যের উৎপাদন ভালো ছিল এবং জিনিসপত্রের মূল্য খুবই সহনীয় পর্যায়ে থাকায় সাধারণ মানুষের ছিল ছন্দময়। ঢাকা ও সোনারগাঁওয়ে মসলিন এবং মুর্শিদাবাদে রেশম উৎপাদন বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত ছিল। এ বাণিজ্য থেকে নবাবরা প্রচুর রাজস্ব পেতেন। চট্টগ্রাম ও হুগলিতে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ডাচ ও ইউরোপীয় চাহিদা ছিল। এছাড়া গান পাউডার ও সল্টপিটার রপ্তানিতেও বাংলা ছিল অগ্রগামী। ইউরোপীয় বণিক গোষ্ঠী এবং এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় বাংলার বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো মুখরিত থাকত। মুর্শিদকুলি খান ১৭১৭ সালে স্বাধীন নবাবী বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর নবাব সুজাউদ্দিনের শাসনামলে (১৭২৮) রাজস্বনীতি, জমিদারি ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে বিশেষ উন্নতি সাধিত হয়। নবাব আলীবর্দীর সময়ে প্রজা সাধারণ সুখে-শান্তিতে বসবাস করত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ছিল। নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ একটি কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন শহরে পরিণত হয়েছিল, যার জনসংখ্যা ১৭৫০-এর দশকে প্রায় ৭ লাখ ছাড়িয়েছিল। উচ্চবিত্ত হিন্দু ও জমিদারদের পোশাকে মুঘল প্রভাব দেখা যেত; তারা মূল্যবান পোশাক, মণি-মুক্তা খচিত পোশাক, সালোয়ার-কামিজ পরতেন।
খাবার তালিকায় কাবাব, রেজালা, কোরমার মতো মুঘল খাবারের প্রচলন হয়। সে সময় স্থাপত্যশিল্পে, বিশেষ করে মসজিদ, প্রাসাদ ও বাগানের নির্মাণকাজে বড় ধরণের উন্নতি ঘটে। জগৎ শেঠের মতো পরিবারগুলো বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার সাথে জড়িত ছিল এবং নবাব ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে অর্থায়ন করত। সংক্ষেপে, পলাশীর যুদ্ধের পূর্ববর্তী নবাবী আমলে বাংলা অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উন্নত অঞ্চল ছিল। তবে এ সমৃদ্ধি মূলত উচ্চবিত্ত ও বণিক শ্রেণিকে বেশি আকৃষ্ট করলেও, সাধারণ প্রজারাও খাদ্য ও নিরাপত্তার দিক থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল। সুজাউদ্দিনের বাংলায় সৌন্দর্য, সামরিক শক্তি ও রাজস্বনীতি সার্বিকভাবে ইতিবাচক দেখা যায়। ১৭২৮ সালে নবাব সুজাউদ্দিনের শাসন বাংলার প্রশাসন, অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তি তিন ক্ষেত্রেই এক নতুন ধারার সৃষ্টি করে। নবাব আলীবর্দী খানও ছিলেন খুবই বিচক্ষণ ও সুশাসক। তার ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলা ছিলো সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধিতে ভরপুর। ১৭৫৬ সালে মৃত্যুর পর তার দৌহিদ্র মীর্জা মোহাম্মদ সিরাজ-উদ-দৌলা নবাব হিসাবে অভিষিক্ত হোন। তার মাত্র ১৬ মাসের ছিলো শাসনামল যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ও জগৎশেঠ গংরা তাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। তারপরও নবাব সিরাজের শাসনামলে প্রজাদের জীবনযাত্রা ছিলো সমৃদ্ধ ও স্বাচ্ছন্দপূর্ণ। কিন্তু ১৭৫৭ সালে ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে যুদ্ধ নামের প্রহসনের মাধ্যমে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজকে হত্যা করার মাধ্যমে বাংলাসহ উপমহাদেশে কোম্পানী শাসনের গোড়াপত্তন হয়। ফলে সোনার বাংলা বিবর্ণ হতে শুরু করে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা অর্জন করলেও আমাদের প্রিয় জন্মভূমি আর স্বরূপে ফিরতে পারেনি বরং ক্ষমতার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে জৌলুস হারিয়েছে।
আমরা কথায় কথায় বলে থাকি ব্রিটিশরা আমাদের মহাসর্বনাশ করেছে। পাকিস্তানের অপশাসন-দুঃশাসনের কারণে আমরা সামনের দিকে এগুতে পারিনি। কিন্তু এখন বৃটিশও নেই; নেই পাকিস্তানও। কিন্তু আছিয়া-রামিসাদের সম্ভ্রম ও জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারি না। এখন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আমলা-কামলা, মেয়র-কাউন্সিলর-কমিশনার, চেয়ারম্যান-মেম্বার, চৌকিদার-দফাদার আমরা নিজেরাই; বৃটিশ-তো আর নেই- নেই পাকিস্তানও, তাহলে সরকারি স্থাপনায় রডের বদলে বাঁশ দেয় কারা, কারাই বা দেশের সম্পদ লুট করে বেগম পাড়া বানায়; গুলী করে জনতার মিছিলে, প্রদর্শন করে ভোট চুরির নির্লজ্জ মহড়া, সাগর-রুনী ইয়াসমিন-তনুদের ধর্ষণ ও হত্যাকারী কে বা কারা, কারা জড়িত ছিলো পিলখানায় সেনা, শাপলা চত্তরে আলেম ও জুলাই গণহত্যার সাথে? ফরমায়েসী বাদী, দলীয় প্রসিকিউশন ও সাজানো সাক্ষী দিয়ে কারা জনপ্রিয় জাতীয় নেতাদের হত্যা করে দেশের পবিত্র জমিনকে রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত করেছিলো? এসব প্রশ্নের সদুত্তর কি আছে? কারাই বা এ মনমাতানো দেশটাকে শ্রীহীন ও বিবর্ণ করে তুলেছে সে প্রশ্ন এখন দেশপ্রেমী ও আত্মসচেতন মানুষের মুখে মুখে।
ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের অর্ধশতাব্দী পার হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু আমাদের প্রিয় জন্মভূমির লাবণ্য ও জৌলুস এখনো ফেরাতে পারিনি বরং ক্ষমতাকেন্দ্রীক নেতিবাচক রাজনীতির যাঁতাকলে পৃষ্ট হয়ে আরো বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। বারবার আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিপ্লবের পরও স্বার্থান্ধ ও ক্ষমতালিপ্সার রাজনীতি আমাদেরকে সামনের দিকে এগুতে দেয়নি। এমতাবস্থায় সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই আমাদেরকে এ অশুভ রাজনীতির বৃত্ত থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। ফেরাতে হবে হারানো গৌরব ও অতীত ঐতিহ্য।
www.syedmasud.com