ড. এ. এইচ. এম হামিদুর রহমান আযাদ

গতকালের পর

উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য এই নৈতিক রূপান্তর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকÑসবার আচরণে যখন হজ¦ ও কুরবানির এই সততা, ধৈর্য, নম্রতা এবং খোদাভীতি প্রতিফলিত হবে, তখনই উম্মাহর ভেতর থেকে দুর্নীতি, জুলুম ও সামাজিক অনাচার দূর হবে। এই নৈতিক ও আচরণগত বিপ্লবই মুসলিম জাতিকে বিশ্বমঞ্চে আবারো এক অনন্য ও অনুকরণীয় সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে।

ঈমানী শক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয় : হজে¦র সর্বোচ্চ চূড়া হলো ৯ই জিলহজ¦ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। লাখ লাখ শুভ্রবসন পরিহিত মানুষের এই সুবিশাল জনসমুদ্র হাশরের ময়দানের চিত্রকল্প তৈরি করে মানুষের হৃদয়ে আখেরাতের জবাবদিহিতা এবং আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের চেতনাকে তীব্রভাবে শাণিত করে। আরাফাতের ময়দানের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা:) স্পষ্ট করে বলেছেন: “হজ¦ হচ্ছে আরাফাহ (অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের প্রধান রুকন)।” (সুনান আন-নাসায়ী: ৩০১৬, সুনান তিরমিজি: ৮৮৯)

কাবা তাওয়াফের মাধ্যমে মুমিন যেভাবে ঘোষণা করে যে তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু কোনো পার্থিব পরাশক্তি নয়, তেমনি আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে উম্মাহ সমস্বরে ঘোষণা করে যে, সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। যে জাতি একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কাছে মাথা নত করতে শেখে, সে পৃথিবীর কোনো জুলুম, অন্যায় বা স্বৈরাচারী শক্তির কাছে মনস্তাত্ত্বিকভাবে কখনো পরাজিত হতে পারে না। এই তাওহীদী শক্তিই উম্মাহর মাঝে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চূড়ান্ত সাহস জোগায়। সমকালীন ভূ-রাজনীতিতে মুসলিম উম্মাহর যে হীনম্মন্যতা ও মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় লক্ষ্য করা যায়, আরাফাতের এই খাঁটি তাওহীদী শিক্ষা তা চিরে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

চতুর্থত: একটি পরিবারÑত্যাগ ও প্রেরণার বাতিঘর : হজ¦ ও কুরবানির এই সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক শিক্ষালয়টি দাঁড়িয়ে আছে একটি মহান পরিবারের ত্যাগের ইতিহাসের ওপর। যে পরিবারটি বিশ্ব মুসলিমের জন্য ত্যাগের মহত্তম ও চিরন্তন এক আদর্শ। একটি আদর্শ সমাজ গঠনে এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পরীক্ষা ও পুরস্কারের ঘটনা উম্মাহর জন্য বাতিঘর স্বরূপ।

হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পরীক্ষা ও পুরস্কার : হযরত ইব্রাহিম (আ.) জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁর এই আপসহীন জীবন ও সফলতার ঘোষণা দিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন: “আর স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিমকে তাঁর রব কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো পূর্ণ করেছিলেন। আল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানুষের ইমাম (নেতা) বানাবো।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১২৪)

এই পরীক্ষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও অগ্নিপরীক্ষা ছিল, প্রায় ৮৬ বছর বয়সে লাভ করা কলিজার টুকরো পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা সেই দৃশ্যপট তুলে ধরে বলেন: “অতঃপর বালকটি যখন পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহিম তাকে বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে তোমাকে জবেহ করতে দেখেছি। এখন বলো, তোমার অভিমত কী?” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত : ১০২)

পুরস্কার: এই কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে তিনটি অসামান্য পুরস্কারে ভূষিত করেন: (১) বিশ্বনেতৃত্বের মর্যাদা, (২) মাকামে ইব্রাহিম ও (৩) আল্লাহর খলীল হওয়া।

হযরত হাজেরা (আ.)-এর পরীক্ষা ও পুরস্কার : একজন নারী হিসেবে হযরত হাজেরা (আ.) যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও অবিচল ঈমানের পরিচয় দিয়েছেন, তা আধুনিক বস্তুত্ববাদী নারীবাদের অহংকার চূর্ণ করার জন্য এক পরম শিক্ষা। তাঁর পরীক্ষাগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন থেকে কঠিন।

আল্লাহর নির্দেশে এক ফোঁটা পানি ধূ ধূ মরুভূমিতে দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তানসহ একাকী নির্জনতায় অবস্থান করা।

তীব্র তৃষ্ণায় ছটফট করতে থাকা সন্তানের জীবন বাঁচাতে মক্কার তপ্ত বালুর ওপর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে একা সাতবার হন্যে হয়ে দৌড়ানো।

দীর্ঘ সময় স্বামী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থেকে এক প্রতিকূল পরিবেশে সন্তান লালন-পালনের কঠিন সংগ্রাম করা।

পুরস্কার : আল্লাহ তাআলা তাঁর এই চরম তাওয়াক্কুল ও ত্যাগকে এমনভাবে কবুল করেছেন যে, তা আজ বিশ্ব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ:

কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর মতো যমযম কূপের নিয়ামত দান।

সাফা-মারওয়ায় সাঈ করাকে হজে¦র অন্যতম প্রধান রুকন হিসেবে বিধান করা।

তাঁর অবস্থানের কারণেই জনবসতিহীন মক্কা আজ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও বরকতময় নগরীতে পরিণত হয়েছে।

হযরত ইসমাইল (আ.)-এর পরীক্ষা ও পুরস্কার : শৈশব থেকেই হযরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন ত্যাগের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর জীবন পরীক্ষা ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য পাঠশালা। পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁকে স্বপ্নের মাধ্যমে পাওয়া আল্লাহর কঠিন নির্দেশটির কথা জানালেন এবং তাঁর মতামত চাইলেন, তখন ইসমাইল (আ.) কোনো অজুহাত বা বাঁচার আকুতি জানাননি। তিনি নবীন বয়সেই বিশ্ববাসীকে আল্লাহর আইনের সামনে মস্তক অবনত করার এক জাজ্বল্যমান শিক্ষা দিয়ে বীরদর্পে জবাব দিলেন: “হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত : ১০২)

পুরস্কার : কিশোর বয়সে আত্মসমর্পণের এই মহোত্তম নজির স্থাপন করায় আল্লাহ তাকে যে পুরস্কৃত করেন, তা হলো: (১) এক মহান কুরবানির বিনিময়ে মুক্ত, (২) নবুওয়াতের মর্যাদা ও (৩) তারই পবিত্র বংশধারায় রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর আগমন।

পঞ্চমত: সমকালীন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও উম্মাহর অর্থনৈতিক সংহতি : আজকের পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহ ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আরাকান ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যে অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় ও অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো কৌশলগত অনৈক্য, সম্পদের অসম বণ্টন এবং আপসকামিতা। আজ যখন গাজা বা ফিলিস্তিনের মজলুম মুসলমানরা জায়নবাদী নিষ্ঠুর আগ্রাসনের মুখে শুধু এক টুকরো রুটি বা বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের জন্য লড়ছে, তখন বিশ্ব মুসলিমের এই হজ¦ ও কুরবানি কেবলই আচার-সর্বস্ব আনন্দ-উৎসব বা বার্ষিক মাংস খাওয়ার উৎসবে রূপ নিলে তা হবে উম্মাহর জন্য চরম এক নৈতিক ট্র‍্যাজেডি।

মুসলিম কমন মার্কেট : হজে¦র মৌসুমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম ব্যবসায়ীরা একত্রিত হন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যদি একটি “অভিন্ন মুসলিম বাজার” এবং সুষম কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেত, তবে মুসলিম বিশ্বকে আজ পশ্চিমা শোষক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন IMF বা World Bank) ওপর পরনির্ভরশীল থাকতে হতো না।

ষষ্ঠত: মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ : বিশ্ব মুসলিমের আত্মপরিচয় ও অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ বাংলাদেশ এক বড় শক্তি। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়ায় উম্মাহর যেকোনো ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের একটি কৌশলগত ও নীতিগত ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অভ্যন্তরে যে গণবিপ্লব সাধিত হয়েছে তা সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘাপটি মেরে বসে থাকা নানা অনিয়মের পুরোনো জঞ্জালকে ধুয়েমুছে দেওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল। তার সঙ্গে হজ¦ ও কুরবানির সাম্য, ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও সুশৃঙ্খল আন্দোলনের শিক্ষা মেলালে আমাদের সামনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে।

আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর লাখো মানুষ হজে¦র বিশ্বমঞ্চে শামিল হন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় যাত্রা নয়, বরং বৈশ্বিক দরবারে এ দেশের মানুষের ঈমানী চেতনার এক বিশাল উপস্থিতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল সংখ্যক হাজি যখন মক্কার সেই বৈষম্যহীন ভ্রাতৃত্ব আর সামাজিক সুবিচারের জীবন্ত দীক্ষা নিয়ে দেশে ফেরেন, তখন তার প্রতিফলন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে কতটুকু ঘটছে? হজে¦র সেই বৈপ্লবিক শিক্ষা সমাজ সংস্কার, দুর্নীতির মূলোৎপাটন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগানোই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

অন্যদিকে, কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে আমাদের পশুপালন, চামড়া শিল্প ও গ্রামীণ জনপদে যে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়Ñতা কোনো সাধারণ বাণিজ্য নয়। পুঁজিবাদী করপোরেট শোষণের বিপরীতে এটি মূলত ইসলামের এক অনন্য জনকল্যাণমুখী ও সুষম অর্থনৈতিক মডেল। এই বিশাল উৎসবকেন্দ্রিক অর্থপ্রবাহকে যদি পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে তা কেবল দেশের দারিদ্র‍্য আর বেকারত্বই ঘোচাবে না, বরং বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর ও স্বাধীন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করাবে। আর তখনই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উম্মাহর অন্যান্য মজলুম ও নিপীড়িত মানুষের পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর মতো হিম্মত ও সক্ষমতা অর্জন করবে।

বাংলাদেশের এই ভ্রাতৃত্ববোধের সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমাদের ঘরের পাশেই রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের মতো এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কে কাঁধে তুলে নিয়ে এ দেশের মানুষ যে অভাবনীয় উদারতা দেখিয়েছে, তা ইসলামের সেই সোনালী যুগের ‘আনসার ও মুহাজির’দের ঐতিহাসিক ত্যাগ ও চেতনারই এক আধুনিক রূপ। আজ দেশের তরুণ সমাজ যখন বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছে, তখন তাদের সামনে হজে¦র ভ্রাতৃত্বে চেতনা এবং কিশোর ইসমাইল (আ.)-এর আপসহীন ঈমানদীপ্ত চরিত্রই হতে পারে পথ চলার বাতিঘর।

আমরা যদি আমাদের এই বিশাল তরুণ জনশক্তি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ভৌগোলিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে হজ¦-কুরবানির সামষ্টিক শিক্ষাকে সমাজ ও রাষ্ট্রে বাস্তবে রূপ দিতে পারি, তবেই এই জনপদ কেবল নিজের ভাগ্যই বদলাবে না, বরং গোটা মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণে এক অগ্রণী চালিকাশক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

সপ্তমত: ঈদুল আযহার প্রকৃত তাৎপর্য ও বর্তমান সমাজের বিকৃতি : আমাদের সমাজে আজ কুরবানিকে একটি লোকদেখানো প্রতিযোগিতা বা সামাজিক আভিজাত্য প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত করার এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কে কত বেশি টাকা দিয়ে পশু ক্রয় করল, কার পশুর মাংস কত বেশি সুস্বাদু, কার গরুটা কত বেশি মোটাতাজা Ñ এগুলোই আজ আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে আবার গরিবের হক যথাযথভাবে আদায় না করে মাংসের সিংহভাগ নিজের ফ্রিজে জমিয়ে রাখেন সারাবছর খাওয়ার জন্য।

এটি কুরবানির মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কুরবানি কোনো লোকদেখানো উৎসব নয়। আল্লাহ আপনার পশুর দাম বা মাংসের পরিমাণ দেখেন না। তিনি মানুষের অন্তরের অবস্থা দেখেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী (সা:)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন: “বলো, আমার নামায, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি একক ও অদ্বিতীয়।” (সূরা আনআম, আয়াত: ১৬২)

কুরবানির পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার সাথে সাথে আমাদের শপথ নিতে হবে যে, আমরা আমাদের জান, মাল, সম্পদ ও মেধা সবকিছু আল্লাহর দ্বীনের পুনর্জাগরণের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। যদি আমাদের কুরবানি আমাদের ভেতরের অহংকার ও কৃপণতাকে দূর করতে না পারে, তবে তা কেবলই একটি পশু জবাইয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া আর কিছুই নয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, হজ¦ ও কুরবানি কেবল বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিনের ধর্মীয় রুটিন বা ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর উৎসব নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর আত্মশক্তি ও আদর্শিক চেতনা রিচার্জ করার বার্ষিক ‘পাওয়ার হাউস’। একটি জাতির পুনর্জাগরণ বা রেনেসাঁ তখনই সম্ভব, যখন তার সদস্যরা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামষ্টিক কল্যাণে ত্যাগের মানসিকতা লালন করে।

আজকের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে যে, আমাদের প্রকৃত সমৃদ্ধির পথ কেবল পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে বা ভোগবাদের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে নেই; বরং আমাদের মৌলিক ইবাদতগুলোর বিপ্লবী ও গতিশীল শিক্ষাকে ব্যক্তি, সমাজ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রয়োগ করার মধ্যে নিহিত।

ইবরাহীমি আদর্শের সেই আপসহীন ত্যাগ, হযরত হাজেরার সেই অবিচল তাওয়াক্কুল, ইসমাইলের সেই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং মুহাম্মাদ (সা:)-এর আদর্শের সেই সুদৃঢ় বৈশ্বিক ঐক্যই পারে বর্তমানের পরাধীন ও শোষিত মুসলিম উম্মাহকে আবারও বিশ্বমঞ্চের নেতৃত্বের আসনে আসীন করতে। আমাদের হজ¦ ও কুরবানি কেবল আনুষ্ঠানিকতা মুক্ত হয়ে একনিষ্ঠ ঈমানী শক্তির জাগরণ ঘটাক, তবেই বিশ্বমঞ্চে উদিত হবে উম্মাহর এক নতুন গৌরবময় দিগন্ত।