শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে জার্মান বংশোদ্ভূত টমাস ডুলি। গতকাল সকালে বাফুফে তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এই ঘোষণা দেয়। দায়িত্ব পেয়ে ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ গতকালই ঢাকায় পৌঁছান। ফুটবল সমর্থকদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে গোপনীয়তার সাথে নতুন কোচকে ঢাকায় এনেছে বাফুফে। স্প্যানিশ কোচ ক্যাবরেরার বিদায়ের পর নতুন কোচ নিয়োগে শুরু হয় নানা নাটক। ২৭৩ থেকে ২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা, তারপর ১১ জনকে অনলাইন ইন্টারভিউয়ে ডাকা হয়। প্রাক্তন ওয়েলস কোচ ক্রিস কোলম্যানের সঙ্গে আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েও ভেঙে যায়। তার পুরো কোচিং স্টাফ আনার দাবি এবং উচ্চ বেতনের কারণে চুক্তি হয়নি। থমাস ডুলি যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক। তিনি দলটির অধিনায়ক ছিলেন ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে। থমাস ডুলি এ মাসেই গায়ানার কোচ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তারপর থেকেই ডুলির নাম আলোচনায় আসে। থমাস ডুলির জন্ম ১৯৬১ সালের ১২ মে জার্মানির বেচহোফেনে। তার বাবা ছিলেন আমেরিকান সেনাবাহিনীর সদস্য এবং মা জার্মান। পুরো শৈশব-কৈশোর জার্মানিতে কাটানো ডুলি জার্মান ফুটবলের পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন। হাভিয়ের কাবরেরার উত্তরসূরি হলেন ডুলি। কাবরেরার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কোচ নিয়োগ নিয়ে কয়েকদিন ধরে টানাপোড়েন চলছিল। অবশেষে সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে নতুন কোচের নিয়োগ চূড়ান্ত করে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। আগামী ৫ জুন ইউরোপের দেশ সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে ম্যাচ। খেলোয়াড়ি জীবনে ডুলির ক্যারিয়ারও সমৃদ্ধ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। তিনি ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেন। ১৯৯৮ আসরে দলটির অধিনায়কও ছিলেন তিনি। মোট ৮১ ম্যাচে ৭ গোল করেন টমাস ডুলি। ক্লাব ক্যারিয়ারে তিনি বায়ার লেভারকুজেন ও শালকের মতো জার্মান ক্লাবে খেলেছেন। শালকের হয়ে ১৯৯৭ সালে উয়েফা কাপ (বর্তমানে ইউরোপা লিগ) জেতেন এবং ১৯৯০-৯১ মৌসুমে এফসি কাইজারস্লাউটার্নের হয়ে বুন্দেসলিগা শিরোপাও জয় করেন। খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার শেষে ২০০২ সালে কোচিংয়ে নাম লেখান ডুলি। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের কোচ ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফিলিপাইনের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার অধীনে ফিলিপাইন অপরাজিত থেকে এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় এবং ইতিহাসের সর্বোচ্চ র‌্যাঙ্কিং অর্জন করে। ২০২২ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আবারও ফিলিপাইন দলের দায়িত্বে ফেরেন তিনি। এরপর ২০২৫ সাল পর্যন্ত গায়ানা জাতীয় দলের প্রধান কোচ ছিলেন ডুলি, যেখানে তার অধীনে দলটি চার ম্যাচে চারটিতেই জয় পায়। এ ছাড়া তিনি ভিয়েতনামের ক্লাব ভিয়েতেলের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন। বাফুফের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দল গঠন ও উন্নয়নে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে ডুলির। এশিয়ান ফুটবলের বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং সমর্থকদের আবেগ সম্পর্কে তার গভীর ধারণা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ ফুটবলের তরুণ খেলোয়াড়দের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দলকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও সফল করে তোলাই তার প্রধান লক্ষ্য। আগামী ৫ জুন ডুলির অধীনে বাংলাদেশের প্রথম মিশন হবে সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ, যেখানে ইউরোপের কোনো দেশের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো মাঠে নামবে বাংলাদেশ জাতীয় দল। গতকাল সকালে ঢাকায় নেমে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে ক্রীড়া লেখক সমিতির পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে এসেছেন। সেখানে বাংলাদেশে আগমন নিয়ে থমাস ডুলি বলেন, ‘আমি এশিয়ায় বহু বছর কাজ করেছি। আমার মনে আছে, যুক্তরাষ্ট্রের একজন খেলোয়াড় হিসেবে আমরা চীন এবং কোরিয়া... না, জাপানে গিয়েছিলাম। তখন আমি এশিয়া সম্পর্কে খুব একটা পরিচিত ছিলাম না, তাই ভাবছিলামÑআমি জানি না এখানে কাজ করতে পারব কি না। এরপর আমি ফিলিপাইন সম্পর্কে জানতে পারি এবং ফিলিপাইন জাতীয় দলের হয়ে কাজ করার সুবাদে এশিয়ার সব জায়গায় ভ্রমণ করি এবং জায়গাটি আমার দারুণ লেগে যায়। আমি সত্যিই এখানে আবারও কাজ করতে চেয়েছিলাম। এশিয়ায় যদি কোনো সুযোগ আসে, তবে আমি যেতে চাই। আমি বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছুটা জানতামও। তাই যখন প্রধান কোচের এই পদটি খালি হলো, আমি আবেদন করলাম। আমি ভাবলাম এখানে কাজ করতে পারলে দারুণ হবে, কারণ এটি ফিলিপাইনেরও কাছাকাছি যেখানে আমি খেলেছি, আবার আমার বাবা-মায়ের দেশ জার্মানির সাথেও যোগাযোগ রাখা সহজ।’ বাংলাদেশে তার লক্ষ্য নিয়েও ধারণা দিয়েছেন, ‘পুরস্কার পাওয়ার আগে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। জীবনে কোনো কিছু অর্জন করতে হলে আপনাকে কিছু না কিছু ত্যাগ করতেই হবে। আর যারা সেটা করতে রাজি আছে, তাদের নিয়ে আমরা সফল হতে পারব। তাই আমার লক্ষ্য হলো র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৬০ বা ১৫০-এর মধ্যে চলে আসা। এটা রাতারাতি হবে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের ফুটবলে সমর্থকদের উন্মাদনা অনেক। এটা চাপ মনে করছেন না হামজাদের নতুন কোচ, ‘না, এটা কোনো ব্যাপার না, আমি এর জন্য প্রস্তুত। তবে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। আমি সবসময় আমার খেলোয়াড়দের এবং ফেডারেশনকেও বলিÑআমরা যেকোনো কিছু অর্জন করতে পারি, যদি লক্ষ্যটি বাস্তবসম্মত হয়। আর আমরা গত কত বছর ধরে কিছু জিতিনি, ২৩ বছর? এখন সময় এসেছে কিছু করে দেখানোর।’