আমিন আল আসাদ
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমগ্র সাহিত্যকর্ম আমাদের জাতীয় জীবনের নানাবিধ অধ্যায় ও বৈশিষ্টকে পূর্ণরূপে ধারণ করেছে। কবি নজরুল ইসলাম এমন এক বিস্ময়কর কাব্যমেধার নাম যাকে কোন দেশ কাল পাত্রের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁর কবিতা ও গান প্রথমত স্পর্শ করেছে মানবতাকে। দেশাত্মবোধ, স্বজাত্যবোধ, অসাম্প্রাদায়িকতাবোধ সহ সামাজিক ও মানবিক জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁর লেখনিতে। নজরুল জীবনের বহুমাতৃকতাই তাকে জাতীয় পর্যায়ে যেমন করেছে মহিমান্বিত, তেমনি আন্তর্জাতিকতা প্রাপ্তও হয়েছেন তিনি। নজরুলের কবিতা ইংরেজী, হিন্দী, উর্দু, ফারসী, রুশ ও চৈনিক ভাষাতেও অনূদিত হয়েছে।
নজরুল ধর্মের অন্তরনিহিত সৌন্দর্যকে মানবতার সৌন্দর্যরূপে পেশ করেছেন। ধর্মের ভেতরের মানবিক মূল্যবোধকে বের করে এনেছেন। ধর্মের তথাকথিত ধ্বজা নয় এবং আচারসর্বস্ব বক-ধার্মিকতা নয় বরং ধর্মের সঙ্গে যে নৈতিকতার প্রসঙ্গটি জড়িত সেই নৈতিকতাকে সকল অন্যায়-অবিচার, জুলুমের বিপক্ষে সংগ্রামে অসি ও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন নজরুল। বাজিয়েছেন পরাধীনতা থেকে জাতির মুক্তির রণবাদ্য।
ধর্মীয় উপলক্ষসমূহের ভেতর যে দর্শন কাজ করে বা কোন ঐতিহাসিক ঘটনা যা ধর্মের উপলক্ষ হিসেবে স্মরিত বা চর্চিত হয়ে এসেছে এর ভেতরের চেতনাকে গণমুক্তির চেতনা হিসেবে নজরুল তাঁর ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। আর যেহেতু ইসলাম শুধুমাত্র কতিপয় আচারসর্বস্ব ধর্ম নয় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, যার রয়েছে একটা সামাজিক অবকাঠামো যা বিশৃঙ্খল আরব জাতিকে করেছিলো শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সারিবদ্ধ, করেছিলো ঐক্যের মন্ত্রে। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে সে ঐক্যের বিকল্প নেই।
নজরুলের যুগটা ছিলো বৃটিশ সম্রাজ্যে সুর্যাস্ত না যাওয়ার যুগ। নজরুল নানাভাবে বাংলার হিন্দু মুসলমানকে যুগপদভাবে জাগিয়ে দিতে চেয়েছেন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্যে। সেজন্যে একদিকে যেমন লিখেছেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ যা হিন্দু সম্প্রাদায়কে প্রেরণার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করেছে। অপরদিকে মুসলমানদেরকে জাগানোর জন্যে লিখেছেন, ‘মোহররম’ ‘কোরবানী’ ‘বকরিদ’ ‘শহীদী ঈদ’ সহ অনেক কবিতা।
ইসলামের অনন্য উৎসব ঈদ-উল-আযহা। বিশ্বের মুসলমানরা যে মুসলিম পরিচয় বহন করে, সেই পরিচয়ের প্রতিষ্ঠাতা হলেন হযরত ইব্রাহিম (আ)। তাই মুসলিম জাতিকে বলা হয় ‘মিল্লাতে ইব্রাহিম’ বা ইব্রাহিমের জাতি। ইব্রাহিম (আ) হচ্ছেন মুসলিম জাতির পিতা। ত্যাগের পরীক্ষায় বহুবার তিনি হয়েছিলেন পরীক্ষিত। প্রাণের চেয়ে প্রিয় পুত্রকে আল্লাহর রাহে কোরবানি করতে একটুও ছিলো না দ্বিধা-সংকোচ। মানবতাকে বধ করা ছিলো না স্রষ্টার উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য ছিলো ইব্রাহিমের হৃদয় পরখ। উত্তীর্ণ হলেন ইব্রাহিম (আ) সেই পরীক্ষায়। আল্লাহ পাঠিয়ে দিলেন দুম্বা। ইসমাইলের (আ)-এর পরিবর্তে সেই দুম্বা জবাই হয়ে গেলো। সেই থেকে অদ্যবধি চলছে ঈদুল আযহায় পশু কোরবানি। কিন্তু এ ঘটনায় অন্তরনিহিত শিক্ষা যে ত্যাগ তা ভুলে গিয়ে আমরাও কি আচারসর্বস্ব হয়ে যাইনি? আমাদের আচরণের ভেতর যে দর্শন বিচরণের কথা ছিলো তা কোথায়? নজরুলতো সেই কথাই বলেছেন তাঁর
‘কোরবানী’ কবিতায়-
‘‘ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন
দুর্বল ভিরু চুপরহো ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন
ধ্বনী ওঠে রণি দুরবানীর
আজিকার এ খুন কোরবানীর
- দুম্বাশির-রুমবাসীর
শহীদের শির সেরা আজি’’ [কোরবানী]
পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে যে জীবন দানের প্রয়োজন। সে জন্যে ইব্রাহিমের মতো পুত্র কোরবানী প্রয়োজন। তবেই স্বাধীনতা আসতে পারে।
- ‘‘আস্তানা সিধা রাস্তানয়
- আযাদি মেলে না পস্তানোয়
- দস্তা নয় সে সস্তা নয়’’ [কোরবানী]
সেজন্যে দরকার আলীর জুলফিকার-
- ‘‘চরেছে খুন আজ খুনিয়ারার
- মুসলিমে সারা দুনিয়াটার
- জুলফিকার’ খুলবে তার
- দুধারী ধার, শেরে খোদার
- রক্তে পুত-বদন
ওরে শক্তি হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন’’ কোরবানী]
নজরুল তাঁর সংগ্রামী চেতনার ভেতরেই ঈদ-উল-আযহা বা কোরবানীর ঈদের তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছেন। সেটাই তিনি তার ‘বকরীদ’ কবিতায় বলতে চেয়েছেন।
‘‘শহীদানদের ঈদ এলো বকরীদ
অন্তরে চির নৌ-জোয়ান যে তারি তরে এই ঈদ
আল্লার রাহে দিতে পারে যারা আপনারে কোরবান
নির্লোভ নিরহংকার যারা যাহারা নিরভিমান
দানব দৈত্যে কতল করিতে আসে তলোয়ার লয়ে
ফিরদাউস হতে এসেছে যাহারা ধরায় মানুষ হয়ে
অসুন্দর ও অত্যাচারীরে বিনাস করিতে যারা
জন্ম লয়েছে চির-নির্ভিক, যৌবন মাতোয়ারা
তাহাদেরি শুধু আছে অধিকার ঈদগাহে ময়দানে
তাহারাই শুধু বকরিদ করে জান-মাল কোরবানে’
- [বকরীদ/কাব্যগ্রন্থ-জাগড়ন]
আবার বলেছেন-
‘‘ইব্রাহিমের মতো পুত্রেরে আল্লার রাহে দাও
নৈলে কখনো মুসলিম নও মিছে শাফায়াত চাও
নির্যাতিতের লাগি’ পুত্রেরে দাও না শহীদ হতে
চাকুরীতে দিয়া মিছে কথা কও-‘যাও আল্লার পথে’?
বকরীদি চাঁদ করে ফরিয়াদ দাও দাও কোরবানী
আল্লারে পাওয়া যায় না করিয়া তাহার না-ফরমানী
ওমরে, খালেদে, মুসা ও তারেকে বকরীদে মনে কর
শুধু সালওয়ার পরিওনা, ধর হাতে তলোয়ার ধরো’’
[বকরীদ]
এভাবে নজরুল কোরবানী বা ত্যাগের মর্মকে উপলব্ধি করেছেন এবং মুসলিম বীরদেরকে জাতীয় জাগরণের প্রতীক ও প্রেরণা হিসেবে তুলে ধরেছেন। মহান বীরদের ও তাদের কোরবানী ও প্রচেষ্টাসমূহকে স্মরণ করেছেন যে প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়েই জুলুম-জালিম উৎখাত হবে।
সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব, জালিম-মজলুমের সংঘাত, শোষক-শোষিতের লড়াই, নিপীড়ক-নিপীড়িতের যুদ্ধ, ধর্ম-অধর্মের জিহাদ হচ্ছে মানব জাতির ইতিহাস। সত্যের সুরে অসুরকে বিদূরিত করতে আলোর গানে অন্ধকারকে বিদূরিত করতে জমায়েত হতে হবে শহীদের ঈদগাহে। উৎসর্গ করতে হবে আল্লার রাহে অর্থাৎ ন্যায়ের পথে সংগ্রামে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে।
- ‘‘শহীদের ঈদ এসেছে আজ
- শিরোপরি খুন লোহিত তাজ
- আল্লার রাহে চাহে সে ভিখ
- জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে
- আল্লার রাহে তাহারে দে
- চাহি না ফাঁকির মণি মানিক ।।
- চাহিনা ক’ গাভী দুম্বা উট
- কতটুকু দান? সে দান ঝুট
- চাই কোরবানী চাই না দান
- রাখিতে ইজ্জত ইসলামের
- শির চাই তোর তোর ছেলের
- দেবে কি? কে আছো মুসলমান?’’ [শহীদি ঈদ]
সম্রাজ্যবাদী শোষণের অক্টোপাশ থেকে মুক্ত হতে হলে প্রয়োজন জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু। কোন এক দেশের বিপ্লবী নেতা বলেছিলেন। ‘আদর্শ বাস্তবায়ন বা স্বদেশেকে মুক্ত করা অথবা রক্ষা করা আমার কাজ নয়। আমার দায়িত্ব হচ্ছে আমার মাটিতে দুশমন পা রাখার আগে তাকে প্রতিরোধে দেশ ও আদর্শের জন্যে আমার জীবন দিয়ে দেয়া’’ যেমনিভাবে কবি ফররুখ বলেছিলেন-
‘‘জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি
শহীদী রক্তে হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানী’’
কেননা বাঁচার জন্যে প্রয়োজন মৃত্যু। যারা বাঁচার জন্যে ছোটে তারা বাঁচতে পারে না। যারা মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে মরার জন্যে ছোটে তারাই বেঁচে থাকে। তারাই মৃত্যঞ্জয়। নজরুল ইসলামও তাই বলেন—
‘‘শুধু আপনারে বাঁচায় যে
মুসলিম নহে ভন্ড সে
- ইসলাম বলে বাঁচ সবাই
দাও কোরবানী জান ও মাল
বেহেশত তোমার কর হালাল
- স্বার্থপরের বেহেশত নাই।’’ [শহীদী ঈদ]
নজরুল আহ্বান করেছেন ‘শির দে, খুন দে, বৎস শোন’
কেননা- ‘‘গোলামীর চেয়ে শহীদী দরজা অনেক উর্ধে জেনো
চাপরাশীর ওই তকমার চেয়ে তরবারি বড়ো মানো’’