কবিতা আমার
মুজতাহিদ ফারুকী
কবিতা আমার প্রিয়, আশৈশব বুকের পাঁজরে
হাসি খুশিদের সাথে বর-বউ খেলেছি যখন
থেকে থেকে জলরঙে মেঘ জমে উঠেছে দু’চোখে
মান অভিমান গোসসা এইসব অবুঝ নকশার
তখনও বানান শিখে ওঠা হয় নাই
শুধু চেপে থেকেছে গোপনে।
ভোলাদের তেতালা বাড়ির বুড়ো আমগাছ থেকে
ঝোলানো দোলনায় দুলে দুলে
উড়নচণ্ডী মন কখন কে জানে, একা উড়ে গেছে লাল চিলের ডানায়।
কবিতা আমার প্রিয়, আশৈশব
দীনাপুর মধুরঙ বিন্দু নাকফুল বাঁকাচোখে দেখে দেখে
কতদিন কেটেছে বিকেল
সেইসব ঘোরের মৃগেল, বেলাশেষে হয়ে ওঠে ঘরনীর জমজ সতীন।
লিখি যদি ‘বনলতা’, তিনি এসে রোষে জিজ্ঞাসেন,
‘কোনখানে উহার সাকিন, রঙঢঙ চলেছে কতদিন?’
কবিতার মোমের শরীরে হুতোম পেঁচার চোখ লেপটে পড়ে থাকে
আমি মিনমিন করি, সলজ্জ করুণ অক্ষরে
পাশে ‘সেন’ শব্দ জুড়ে চোখ বুঁজে থাকি উদাসীন।
সুযোগ
সজীব তাওহিদ
সুযোগ পেলে শুরুতেই কিনে নেব নিজেকে
ডানে যাবো, বামে যাব। ইচ্ছেমতো ভুলে যাবো।
সহজেই বানিয়ে নেব সহজ জীবন।
পরপুরুষ পর নারী বেচে দেবো প্রথমেই।
বেচে দেবো কোলবালিশ।
হৃদয়ের সাথে লেপটে থাকার সুযোগ...
আমি যাব না কেউ আসবে না।
বেচে দেব রাস্তা সমেত যোগাযোগ
কাপ পিরিচ ডাইনিং টেবিল
শূন্য অন্তঃসারশূন্য বিন্দু বিসর্গ
জীবনবোধ পুরোটাই
সময়ে সঞ্চয়ে মৃত্যুর চেয়ে অবিনশ্বর কিছু নেই।
কিছু একটার অবলম্বনে
মুহাম্মদ রফিক ইসলাম
তার কাছে ফিরে যেতে চাই
পারি না,
দ্বিধা-সংকোচের কাঁটা বিঁধে যায় পথে।
এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে এসে
থমকে দাঁড়াই; লক্ষ অজুহাত, নিষেধের কাছে।
আত্মপক্ষ সমর্পণের সহজ হাত সে যদি
ফিরিয়ে দেয় অবশেষে!
তবে আফসোসের সুতো বাঁধা দীর্ঘ পথে
দীর্ঘশ্বাসের নীরব আকুতিই থাকে,
ঘুরে দাঁড়ানোর কিঞ্চিৎ কোনো অবশেষ থাকে না।
তবু কিছু একটার অবলম্বনে
যদি একটু বাহানা খুঁজে পাই...
সে যদি ভুল করেও ফিরে তাকায় একবার
যদি ফিরে আসে এক পা পিছিয়ে,
তাহলে দশ পা এগিয়ে গিয়ে
হাজার বাঁধা ভাঙতে জানি ফুলের আঘাতে!
দেয়াল
রফিকুল নাজিম
বু’জান তুমি কেমন আছো? হয় না বছর দেখা,
নদী কেবল যায় গো মরে রেখে স্রোতের রেখা!
এই দেশেতে যেদিন এলো উঁচু দালান-কোঠা
সেদিন থেকেই মানুষ একা- ঝরা পাতার বোটা।
পানের বাটা কোথায় গেল- কোথায় শীতল পাটি
চুলে বিলি কাটার বিকেল- ফাগুন দিন কি মাটি?
অনেক হলো একলা থাকার নামে ভালো থাকা
এবার এসো কাঁঠালতলায় শুনি কোকিল ডাকা।
বউঝি মিলে আড্ডা দিতে আবার দাওয়ায় বসি
আইসো, বু’জান- সবাই মিলে মায়ার অঙ্ক কষি।
শ্রমিক
নাজীর হুসাইন খান
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যে মানুষটা রওনা দেয়,
তার কাঁধে ঝুলে থাকে পরিবারের স্বপ্ন।
ইট, বালি, লোহা আর ধুলোর ভিড়ে
সে খুঁজে ফেরে নিজের অস্তিত্বের ঠিকানা।
যার ঘামেই গড়ে ওঠে অট্টালিকার উচ্চতা,
যার পরিশ্রমেই চলে শহরের প্রতিটি চাকা,
যার হাতের ছোঁয়ায় দামি দামি পোশাক ওঠে
আমাদের গায়ে।
আজ তারা বড়ই অবহেলিত।
দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরে আসে ঘরে,
এখানেও চলে সংগ্রাম এক মুঠো ভাতের জন্য।
তবুও মুখে লেগে থাকে তৃপ্তির একরাশ আলো।
স্বপ্ন দেখে মাসের শেষে অথচ আমরা বড়োই নিষ্ঠুর স্বার্থপর।
যাকে আমরা শুধু “শ্রমিক বলেই চিনি।
অথচ আমরা তাদের ঘামের ন্যায্য মূল্য দিতে শিখিনি।
বৈশাখী পূর্ণিমা
কামরুজ্জামান
বৈশাখের পূর্ণিমায় ঝরে টুপটাপ বৃষ্টি
এলোমেলো স্মৃতিগুলো ডানা মেলে লাল নীল
দূরন্ত কৈশোরে রোদে জ্বলা দিন ঝিলমিল
মেঘে ঢাকে চাঁদ যেনো লাজে নব বধূ দৃষ্টি।
ফেলে আসা দিনগুলো ভাষা পায় যেনো ফিরে
রাত তাই আরো স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে রূপে রঙে
বাহুডোরে বেঁধে রাখা ক্ষণগুলো সেই ঢঙে
প্রাণ পায় ফিরে কত দিন পরে স্থিতি ধিরে।
দূর বহু দূরে চলে গ্যাছ একা ফেলে পথে
দিন যায় সন্ধ্যা আসে রাত্রি নামে কালো ছায়া
নিরবধি বহে স্রোতস্বিনী ভাঙে কূল মায়া
আরো সঙ্গীহীন একা ফিরি একা পথে রথে।
টুপটাপ ঝরে বৃষ্টি ক্ষণেক্ষণে বারিধারা
নির্বাণ প্রার্থনা মগ্ন ধ্যান এঁকে যায় রেখা
আলোর প্লাবনে রূপালী স্নানের যাদু শেখা
বৈশাখী পূর্ণিমা সন্তর্পণে ঝরে অশ্রুধারা।
নীলপাতা
ইফতেখার রবিন
বাতাসে ভেসে আসে ছিন্ন চুল-
দুপুরের ক্লান্ত রোদে
নীরবতার কোলাজ।
ধুলোমাখা বিকেলের প্রান্তে
মেয়েটির চোখে জমে থাকে
অজানা কোনো নদীর ঢেউ।
হঠাৎ উড়ে যায় নীল পাতা-
অচেনা প্রজাপতির ডানায়
রঙিন বিষণ্নতার ছায়া।
রূপের ভেতর লুকোনো আগুন,
দহন তার নীরব-
ভালোবাসার অদৃশ্য জ্বরে।
বিষাদের গোপন দরজা
খুলে যায় অচেতন স্বপ্নে,
তবু বালিকা জানে না-
তার দু’চোখে জমে ওঠা মেঘ
কবে নামাবে বৃষ্টি,
কবে ভিজবে অন্ধকারের পথ।
ঘুম
তোয়াবুর রহমান
মেলা রাত হয়ে গেছে
কেবল শুধু চোখের লাফালাফি
মাথাটা বালিশের এপাশ আর ওপাশ
চোখে ঘুমের বালায় নেই।
রাতের মধ্যাহ্নে অহেতুক ভাবনার বসবাস
ও দিকে মনে হয় চিন্তার কোন ঘুম নেই
চিন্তা যেন হাত পা গুটিয়ে ঠিক বসে আছে
আমার চোখের পাপড়ির অগ্রভাগে ।