জিয়ানগর (পিরোজপুর) সংবাদদাতা : চারদিকে ছোট-বড় অসংখ্য নদী আর খাল দিয়ে বেষ্টিত দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পিরোজপুর। প্রকৃতির দানে জলাভূমির কোনো অভাব না থাকলেও এই জনপদের মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে দুর্লভ বস্তুর নাম ‘সুপেয় পানি’।

গ্রীষ্মের দাবদাহ শুরু হওয়ার আগেই পিরোজপুর পৌর এলাকায় দেখা দিয়েছে পানির তীব্র সংকট। পানির অভাবে জনজীবন এতটাই অতিষ্ঠ যে, অনেক ভাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। গত কয়েক মাস ধরে চলা এই সংকট এখন মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণেরা জানান, ৫০ বছর আগেও পিরোজপুরের মানুষের সুপেয় পানির প্রধান উৎস ছিল বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত নির্দিষ্ট পুকুর ও নলকূপ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যর চাহিদা মেটাতে ১৯৮৩ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ একটি পানি শোধনাগার বা ‘ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট’ চালু করে। শুরুতে এর উৎপাদনক্ষমতা ছিল প্রতি ঘণ্টায় ৫০ হাজার লিটার। সময়ের বিবর্তনে বর্তমানে এর উৎপাদন ৩ লাখ লিটারে উন্নীত হলেও চাহিদার তুলনায় তা যৎসামান্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেড়শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পিরোজপুর পৌরসভাটি ১৯৮৭ সালে জেলার মর্যাদা পায়। পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় ২ লাখ বাসিন্দার জন্য প্রতি ঘণ্টায় ৯ লাখ লিটার সুপেয় পানির প্রয়োজন। কিন্তু শোধনাগারটি উৎপাদন করতে পারছে মাত্র ৩ লাখ লিটার। অর্থাৎ, চাহিদার মাত্র এক- তৃতীয়াংশ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে নদী ও শোধনাগারের নিজস্ব পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় এই উৎপাদনক্ষমতা আরও আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। এদিকে পানির অভাবে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে।

পৌরসভার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে কর্মরত বাবুল হাওলাদার সংকটের মূলে কিছু কারিগরি সমস্যার কথা তুলে ধরে জানান, শোধনাগারের পুকুরটি দীর্ঘদিন খনন না করায় পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। এছাড়া শহরজুড়ে পানি সরবরাহের জন্য ৩০-৪০ বছর আগে যে পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলো অত্যন্ত সরু। বর্তমান বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের চাহিদা মেটানোর জন্য এই চিকন পাইপ দিয়ে পাইপগুলো পরিবর্তন করে মোটা পাইপ স্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

পৌরসভার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে জানান, ১৯৮৩ সালে যখন প্লান্টটি শুরু হয় তখন গ্রাহক ছিল মাত্র ৫০০। বর্তমানে সেই সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

তিনি আরো বলেন, চলতি মৌসুমে নদী ও খালের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। তবে আমরা হাত গুটিয়ে বসে নেই। নতুন একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ৯ লাখ লিটার চাহিদাই পূরণ করা সম্ভব হবে। তবে বিশাল অর্থ বরাদ্দ ও সময়সাপেক্ষ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত আমাদের বিকল্প পন্থায় সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করতে হবে।

তবে পৌরবাসীর দাবি, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে জরুরি ভিত্তিতে পুকুর খনন ও পাইপলাইন সংস্কারের মাধ্যমে এই চরম দুর্ভোগ থেকে তাদের মুক্তি দেয়া হোক।